
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ কাগজে কালি দিয়ে ছাপা হলেও এর প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে শহীদদের রক্তের অক্ষরে। তাই জুলাই সনদের আলোকে দেশ পরিচালনার পথে অগ্রসর হতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জুলাই শহীদদের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজনে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অডিটরিয়ামে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দরজা খুলতে যে মূল চাবিকাঠি প্রয়োজন, তা হলো গণভোট। এই চাবিটি এখন জনগণের হাতে। জনগণ যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই পথেই আগামীর বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, সংস্কারের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগে আমরা সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-কে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এবারের গণভোটই সবচেয়ে কার্যকর ও গণতান্ত্রিক মাধ্যম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ থাকলেও গণভোটের ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় কোনো আইনগত বাধা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, ইউরোপে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪৮টি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। বাংলাদেশেও গণভোট নতুন কোনো ধারণা নয়; অতীতে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সরকারে থেকে কেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রায়ের বাজার কবরস্থানে পাওয়া ১১৪টি বেওয়ারিশ লাশ, তরতাজা যুবক সোহেল রানার মরদেহ খোঁজার জন্য তার মায়ের আর্তনাদ এবং প্রায় ১৪ শত শহীদ ও ১৪ হাজার আহত-পঙ্গু মানুষের আত্মত্যাগ কি আমরা ভুলে গেছি? এই ত্যাগের বিনিময়েই একটি নতুন বাংলাদেশের পথ তৈরি হয়েছে। তখন এ ধরনের প্রশ্ন ওঠা অনুচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যারা এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের নৈতিক দায় রয়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদমুক্ত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। এবারের গণভোট সেই নতুন বাংলাদেশ বা নতুন বন্দোবস্তের পক্ষে জনগণের মতামত যাচাইয়ের সুযোগ।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে রায় গেলে সংবিধানে ফ্যাসিবাদের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চান, তাদেরই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়া উচিত।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. মোখতার আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালী, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক এবং খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. জাহিদুল হাসান।
মতবিনিময় সভায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলার জেলা প্রশাসকসহ বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজ, এনজিও প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশ নেন।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 
























