ঢাকা ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

বাংলাদেশে মাদক ঠেকাতে কুকুর নামাতে চায় পুলিশ

সংগৃহীত ছবি।

দেশে প্রবেশ করা ইয়াবার বড় অংশই কক্সবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। মাদক পাচারের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে এবার নতুন কৌশল হিসেবে প্রশিক্ষিত কুকুর বা কে-৯ স্কোয়াড ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে কক্সবাজারে বিশেষ ডগ স্কোয়াড গঠনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে কুকুর সংগ্রহের পরিবর্তে বর্তমানে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী মাদক শনাক্তে দক্ষ ও পরীক্ষিত কুকুরগুলোকে বাছাই করে কক্সবাজারে মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ কয়েকটি ইউনিটে থাকা প্রশিক্ষিত কুকুরদের মধ্য থেকে উপযুক্ত সদস্য নির্বাচন করা হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর, আইকনিক রেলস্টেশন, মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টে কে-৯ স্কোয়াডের কার্যক্রম পরিচালনার চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়া সন্দেহভাজন যানবাহনগুলোকে বিশেষ তল্লাশির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ জন্য মহাসড়কের পাশে নির্দিষ্ট স্থানে বাস ও অন্যান্য যানবাহন থামানোর ব্যবস্থা করা হবে। এসব স্থানে যানজট সৃষ্টি না করেই কুকুরের মাধ্যমে মাদক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কক্সবাজারে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহারের পরিকল্পনা এখন অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া রোধে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও অর্থ) মো. নাজিমুল হকও জানান, সড়কপথে চলাচলকারী সন্দেহভাজন যানবাহনে দ্রুত ও কার্যকর তল্লাশি পরিচালনায় কে-৯ ইউনিট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, কক্সবাজারকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০ জন সন্দেহভাজন ও শীর্ষ কারবারির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রেপ্তারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

শুধু গ্রেপ্তারই নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করছে। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে মাদক কারবারিদের তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান, সমন্বিত অভিযান এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মিয়ানমার থেকে শুধু ইয়াবাই নয়, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন নামে পরিচিত ইয়াবার চালান সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

তদন্তে দেখা গেছে, কিছু রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী যৌথভাবে এই চক্র পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে বাহক বা পরিবহনকারী ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এবং সীমান্তঘেঁষা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও নজরদারি চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবার মতো ক্ষুদ্র আকারের মাদকদ্রব্য অনেক সময় স্ক্যানিং প্রযুক্তিতেও শনাক্ত করা কঠিন হয়। সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুর অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের ঘ্রাণশক্তি মানুষের তুলনায় বহু গুণ বেশি হওয়ায় লুকিয়ে রাখা মাদক দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং র‍্যাব কক্সবাজারে কে-৯ ইউনিট ব্যবহার করে বিভিন্ন অভিযানে সফলতা পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুলিশ বাহিনীও একই ধরনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকবিরোধী অভিযানের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট মামলার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হাজার হাজার মামলা রেকর্ড হয়েছে, যা মাদক বিস্তারের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।

এদিকে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনে ইতোমধ্যে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও নিজস্ব কে-৯ স্কোয়াড গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় এবং প্রশিক্ষিত কে-৯ ইউনিটের ব্যবহার একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশে মাদক ঠেকাতে কুকুর নামাতে চায় পুলিশ

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৪২:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

দেশে প্রবেশ করা ইয়াবার বড় অংশই কক্সবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। মাদক পাচারের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে এবার নতুন কৌশল হিসেবে প্রশিক্ষিত কুকুর বা কে-৯ স্কোয়াড ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে কক্সবাজারে বিশেষ ডগ স্কোয়াড গঠনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে কুকুর সংগ্রহের পরিবর্তে বর্তমানে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী মাদক শনাক্তে দক্ষ ও পরীক্ষিত কুকুরগুলোকে বাছাই করে কক্সবাজারে মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ কয়েকটি ইউনিটে থাকা প্রশিক্ষিত কুকুরদের মধ্য থেকে উপযুক্ত সদস্য নির্বাচন করা হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর, আইকনিক রেলস্টেশন, মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টে কে-৯ স্কোয়াডের কার্যক্রম পরিচালনার চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কক্সবাজার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়া সন্দেহভাজন যানবাহনগুলোকে বিশেষ তল্লাশির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ জন্য মহাসড়কের পাশে নির্দিষ্ট স্থানে বাস ও অন্যান্য যানবাহন থামানোর ব্যবস্থা করা হবে। এসব স্থানে যানজট সৃষ্টি না করেই কুকুরের মাধ্যমে মাদক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কক্সবাজারে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহারের পরিকল্পনা এখন অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া রোধে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও অর্থ) মো. নাজিমুল হকও জানান, সড়কপথে চলাচলকারী সন্দেহভাজন যানবাহনে দ্রুত ও কার্যকর তল্লাশি পরিচালনায় কে-৯ ইউনিট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, কক্সবাজারকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায়ীদের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০ জন সন্দেহভাজন ও শীর্ষ কারবারির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রেপ্তারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

শুধু গ্রেপ্তারই নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎসও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।

কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স কাজ করছে। সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে মাদক কারবারিদের তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান, সমন্বিত অভিযান এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মিয়ানমার থেকে শুধু ইয়াবাই নয়, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন নামে পরিচিত ইয়াবার চালান সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

তদন্তে দেখা গেছে, কিছু রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী যৌথভাবে এই চক্র পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে বাহক বা পরিবহনকারী ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এবং সীমান্তঘেঁষা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও নজরদারি চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবার মতো ক্ষুদ্র আকারের মাদকদ্রব্য অনেক সময় স্ক্যানিং প্রযুক্তিতেও শনাক্ত করা কঠিন হয়। সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুর অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের ঘ্রাণশক্তি মানুষের তুলনায় বহু গুণ বেশি হওয়ায় লুকিয়ে রাখা মাদক দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং র‍্যাব কক্সবাজারে কে-৯ ইউনিট ব্যবহার করে বিভিন্ন অভিযানে সফলতা পেয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুলিশ বাহিনীও একই ধরনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাদকবিরোধী অভিযানের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট মামলার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হাজার হাজার মামলা রেকর্ড হয়েছে, যা মাদক বিস্তারের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।

এদিকে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনে ইতোমধ্যে স্ক্যানার মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও নিজস্ব কে-৯ স্কোয়াড গঠনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় এবং প্রশিক্ষিত কে-৯ ইউনিটের ব্যবহার একসঙ্গে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক পাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব হবে।