
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এদিকে, মামলার প্রধান আসামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমান আগে হত্যার দায় স্বীকার করে বক্তব্য দিলেও পরবর্তীতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে ফজলুর বর্তমান বক্তব্যের অসংগতি রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি আগামী সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের চেষ্টা চলছে।
যেভাবে ঘটে রুনা হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের ৪ মার্চ বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের দ্বিতীয় তলায় সমাজকল্যাণ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমানও নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
নিহত শিক্ষিকার চিৎকার শুনে ভবনে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাঁরা কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দুজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসমা সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
চারজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
এ ঘটনায় নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বাদী হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় কর্মচারী ফজলুর রহমানকে। অন্য তিন আসামি হলেন সাবেক কর্মচারী ও উপ-রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান।
মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারায় করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সুস্থ হওয়ার পর গত ১ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার অপর তিন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কমিটি
রুনা হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তদন্তের উদ্যোগ নেয়। গত ৭ মার্চ হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং উপ-রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মো. গোলাম মওলাকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২৯ জুন অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২৭৪তম সাধারণ সভার ৩২ নম্বর প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান একাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মাছুদুল হক তালুকদার। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (পিআরএল) ড. আশরাফুর রহমান এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন।
কমিটি ইতোমধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি আগামী সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
আগের বক্তব্য থেকে সরে নির্দোষ দাবি ফজলুর
হত্যাকাণ্ডের পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে ফজলুর রহমান হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন বলে তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে। ওই বক্তব্যে তিনি সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলির কারণে ক্ষোভের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
তবে কারাগারে যাওয়ার পর তিনি আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সূত্র জানায়, কারাগারে গিয়ে কমিটির সদস্যরা ফজলুর সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেন। এ সময় মৌখিকভাবে প্রশ্ন করা হলেও তিনি লিখিতভাবে উত্তর দেন।
লিখিত বক্তব্যে ফজলু দাবি করেন, শিক্ষিকা রুনা তাঁর কাছে থিসিস পেপার চাইলে তিনি ওই কক্ষে যান। সেখানে গিয়ে দুই মুখোশধারী ব্যক্তিকে রুনাকে ছুরিকাঘাত করতে দেখেন বলে দাবি করেন। তাঁদের বাধা দিতে গেলে তাঁকেও আঘাত করা হয় এবং হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এরপর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন বলে তাঁর দাবি।
সিসিটিভি ফুটেজ ও বক্তব্যে অসংগতি দেখছে তদন্ত কমিটি
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সদস্যদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের দিন ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ফজলুকে নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখা যায়। তাঁদের মতে, ফজলুর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের অসংগতি রয়েছে।
কমিটির সদস্যরা জানান, ফজলু কক্ষে দুই মুখোশধারীর উপস্থিতির কথা বললেও ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো কক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিরা কীভাবে বেরিয়ে গেলেন এবং পরে কে দরজা বন্ধ করলেন—এ বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
হত্যাকাণ্ডের দিনের সিসিটিভি ফুটেজের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেল ৪টা ১ মিনিটে ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে পলিথিনে মোড়ানো একটি বস্তু নিয়ে বের হন ফজলু। পরে বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে তিনি দ্বিতীয় তলায় রুনার কক্ষের দিকে যান।
এর প্রায় দুই মিনিট পর রুনার চিৎকার শুনে নিচে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা ওপরে ছুটে যান। সেখানে তাঁরা কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে এবং ফজলুকে নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির বক্তব্য
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কমিটির সদস্যরা কারাগারে গিয়ে ফজলুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টার ওই সাক্ষাৎকারে তিনি মৌখিকভাবে উত্তর না দিয়ে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফজলু নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সেগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে কমিটির পর্যবেক্ষণ।
অন্যদিকে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, পূর্ববর্তী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে তাঁরা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, যা আগামী সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করা হবে।
শিগগিরই চার্জশিট দেওয়ার কথা পুলিশের
মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, রুনা হত্যা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন আলামত অনেক আগেই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো শেষ হলে আগামী সপ্তাহে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের চেষ্টা করা হবে। আসামি কখন কী বক্তব্য দিয়েছেন, তা তদন্তের মূল গতিপথে তেমন প্রভাব ফেলেনি বলেও জানান তিনি।
রুনা হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে অভিযোগপত্র জমা না হওয়ায় মামলার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদ সাদ, ইবি প্রতিনিধিঃ 























