
আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে এর দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক সংযোগ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে আছে। বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন এবং ল্যান্ডিং স্টেশনে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে কম মূল্যে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ সম্ভব হবে, যার সুবিধা পৌঁছাবে সাধারণ গ্রাহক পর্যায়েও।
মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বিটিসিএল প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ বিক্রি করত ৭৫ হাজার টাকায়। ২০১৬ সালে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথের দাম নেমে আসে ৫০০ টাকায়, আর বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২০ টাকায়। বক্তারা দাবি করেন, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল চালু করে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে ২০২৭ সাল নাগাদ এই দাম আরও কমে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় নেমে আসতে পারে।
উপস্থাপনায় আরও জানানো হয়, বিএসসিপিএলসি সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ নামের দুটি সাবমেরিন ক্যাবলে মোট ৮১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব ৩ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, এবং একই সময়ে নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকারও বেশি।
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে। বক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়লেও বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল ও আন্তর্জাতিক রুটের সীমিত সুযোগের কারণে বাজারে কাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না, যা সেবার মূল্য কমানোর সম্ভাবনাকেও সীমিত করে রাখছে।
সেমিনারে গুগল, মেটা, আকামাই ও ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সংযোগের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উপযুক্ত নীতিমালার অভাব এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থিতিশীল ও পূর্বাভাসযোগ্য নীতিমালা এবং উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে দেশে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও হাইপারস্কেলারদের বিনিয়োগের পথ সুগম হবে বলে মত দেন তারা।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের পক্ষ থেকে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ল্যান্ডিং স্টেশনে ক্যারিয়ার-নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার, একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন, দেশীয় ফাইবার শেয়ারিং এবং আইএক্সপি ও স্থানীয় পিয়ারিং সম্প্রসারণের সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ওপর আরোপিত করের যৌক্তিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হাকিম বলেন, বিএসসিপিএলসির একচেটিয়া কর্তৃত্ব বজায় রেখে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংযোগ অবকাঠামোয় প্রতিযোগিতা বাড়ানো জরুরি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে ব্যান্ডউইথের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যার সুফল সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা মত দেন, আন্তর্জাতিক সংযোগে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের সুযোগ তৈরি এবং প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ডিজিটাল অবকাঠামো হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্প প্রধান মাহমুদ শাহেদ এবং আইএসপিএবির কোষাধ্যক্ষ মইন উদ্দিন আহমেদ। টিআরএনবির সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন সিডিনেট কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান এবং বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান।
অধিকার ডেস্কঃ 
























