
সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো ফেনী সফরে আসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে পূর্বনির্ধারিত ১৭ সেপ্টেম্বরের সফরসূচি পিছিয়ে নতুন করে আগামী ১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রশাসন একাধিক দফায় বৈঠক করছে, একই সঙ্গে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপি নেতারাও।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে জেলার উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা নানা দাবি তুলে ধরছেন। এসব দাবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ফেনীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ফেনীর উন্নয়নে ১৬টি দাবি ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সোনাগাজীতে জেগে ওঠা বিশাল চরাঞ্চলে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রস্তাব।
তার প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে মুছাপুর রেগুলেটর পুনঃনির্মাণ ও সোনাগাজী রেগুলেটর সম্প্রসারণ, কহুয়া-মুহুরী বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় বিলোনিয়া থেকে মুহুরী সেচ প্রকল্পের সুইচগেট পর্যন্ত নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি করে দুই পাশে উঁচু বাঁধ নির্মাণ, ফেনী সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ পুনরায় চালু করা এবং ফেনী শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে দমদমা খাল, পাগলীছড়া ও দাউদপুর খাল দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা। এ ছাড়া তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন।
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট পার্থ পাল চৌধুরীও তার ফেসবুক পোস্টে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। তিনি ফেনী সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার জোর দাবি জানিয়ে বলেন, নিজস্ব জায়গায় এসব প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন সম্ভব।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবউল করিম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে ব্যস্ততার কারণে ১৭ সেপ্টেম্বরের সফর স্থগিত হলেও আগামী ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ফেনীতে আসবেন।
এই সফর সামনে রেখে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসন এবং বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি একনেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে পরশুরাম-সুবার বাজার সড়কের মুহুরী নদীর তীরে উদ্বোধনী ফলক ও জনসভাস্থল প্রস্তুতের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সুরক্ষা বাহিনী (এসএসএফ) ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেছে। পরশুরাম মডেল সরকারি পাইলট স্কুল মাঠে হেলিপ্যাড নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে এবং ফেনী-পরশুরাম প্রধান সড়কের সংযোগস্থলে মেরামত ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চালাচ্ছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতনু বড়ুয়া জানান, সভাস্থলে বিশুদ্ধ পানির ট্যাংক ও পোর্টেবল টয়লেট স্থাপনসহ সার্বিক প্রস্তুতি সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, একই সফরে পার্শ্ববর্তী ফুলগাজী উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং খালেদা জিয়ার মহিলা কলেজ সরকারীকরণের কর্মসূচির প্রস্তুতিও অব্যাহত রয়েছে।
সফরের শুরুতে জেলার পরশুরামে ঘাটঘর এলাকায় মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, বাঁধ ভাঙন ও বন্যায় মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা কমবে এবং বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষ এর সুফল পাবে। প্রকল্পটির কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ১৬ জুন একনেকে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সফরকালে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম ও পুরোহিতদের ভাতা প্রদান এবং ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন সরকারপ্রধান। এ ছাড়া তিনি তার নানার বাড়ি ফুলগাজীর শ্রীপুরের মজুমদার বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং পারিবারিক কবরস্থান জিয়ারত করবেন। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা এবং রোগীদের বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসার বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সফরকালে তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সুধী সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন।
ফুলগাজী সরকারি হাই স্কুল মাঠে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সূত্র জানায়, এই জনসভাস্থল থেকে ফুলগাজীকে দেশের নতুন পৌরসভায় উন্নীত করার ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এই ঘোষণার ফলে ফেনী জেলার ছয় উপজেলায় ছয়টি পৌরসভা গঠিত হবে। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার পৈত্রিক বাড়ি ও নিজের নির্বাচনী এলাকা ফুলগাজীকে থানা থেকে উপজেলায় উন্নীত করেছিলেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় ১৯৯৩ সালে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফেনী-বিলোনিয়া রেলপথ পুনরায় চালুর দাবি জানাবেন বিএনপি নেতারা। তাদের মতে, রেলপথ চালু হলে জেলার উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
অধিকার ডেস্কঃ 

















