
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে যুক্তরাষ্ট্র সফরে চীনের প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ হয়নি। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান ও বিরল খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ফলে সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমলেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার অবসান ঘটেনি।
চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বৈশ্বিক উত্থান ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ কারণে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়াশিংটনের চাপ কমানো বেইজিংয়ের অন্যতম প্রত্যাশা।
তবে এবারের ট্রাম্প-শি বৈঠকে চীন প্রত্যাশিত সব সুবিধা পায়নি। দুই দেশের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমানোর যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটির মেয়াদ কয়েক মাস বাড়ানো হয়েছে। নভেম্বর থেকে সমঝোতাটি আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে চীন এটি অন্তত এক বছরের জন্য বাড়ানোর প্রত্যাশা করেছিল।
এর ফলে শুল্ক, বিরল খনিজ সরবরাহ এবং উন্নত মার্কিন চিপে চীনের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বরং বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি ছাড় দেওয়ার আগে চীনের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চাইছে ওয়াশিংটন।
চীনের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ চাপ
চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও শি জিনপিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। দেশটি বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করলেও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা ব্যয় তুলনামূলক দুর্বল। তরুণদের বেকারত্বও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি আবাসন খাতে মূল্যপতন অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চীনের রপ্তানি এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা এবং বড় ধরনের মার্কিন শুল্ক এড়ানো বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যু
শি জিনপিংয়ের আলোচনায় তাইওয়ান প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে। তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রয়কে দীর্ঘদিন ধরেই চীন নিজেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা হিসেবে বিবেচনা করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি রয়েছে। এর আগে শি জিনপিং ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ভুল পদক্ষেপ দুই দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে তাইওয়ানকে ঘিরে মার্কিন নীতি সীমিত করার পক্ষে শি জিনপিং যুক্তি তুলে ধরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এতে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে।
বৃহস্পতিবার শি আশা প্রকাশ করেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্র ‘সঠিক অবস্থান’ বজায় রাখবে। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
এআই নিয়েও আলোচনা
দুই নেতার বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সমঝোতা হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
শি জিনপিং বলেন, এআইয়ের ব্যবহার এমনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে প্রযুক্তিটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়। অন্যদিকে ট্রাম্প এর আগে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছে ‘পান্ডা কূটনীতি’
বাণিজ্য ও প্রযুক্তির পাশাপাশি বৈঠকে চীনের পরিচিত ‘পান্ডা কূটনীতি’র বিষয়টিও উঠে এসেছে। আটলান্টায় পাঠানোর জন্য পিং পিং ও ফু শুয়াং নামের দুটি জায়ান্ট পান্ডা পাঠানোর ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছিল। এবার শি জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পান্ডা দুটি যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে।
শুক্রবার দুই নেতার আরও কিছু কর্মসূচি রয়েছে। তাঁরা চা পান এবং জাতীয় আর্কাইভ পরিদর্শন করবেন বলে জানা গেছে। ফলে সফর ঘিরে আরও কিছু ঘোষণা আসতে পারে।
তবে বেইজিংয়ের জন্য এই সফরের তাৎপর্য শুধু চুক্তি বা নীতিগত সমঝোতায় সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্পের বিমানবন্দরে শিকে স্বাগত জানানো এবং রাষ্ট্রীয় ভোজের মতো আনুষ্ঠানিক আয়োজন চীনের দৃষ্টিতে সফরটির কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বললেও দুই দেশের মূল প্রতিযোগিতাগুলো এখনো বহাল। বৈশ্বিক প্রভাব, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মতো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা অব্যাহত থাকার চিত্রই বৈঠকের পর স্পষ্ট হয়েছে।
অধিকার ডেস্কঃ 























