
মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ কর্মক্ষেত্রে থাকলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) অধ্যয়নরত বিবাহিত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট একাডেমিক ছুটির ব্যবস্থা নেই। ফলে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় শারীরিক-মানসিক নানা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে।
একদিকে গর্ভাবস্থার শারীরিক জটিলতা ও সন্তান জন্মদানের প্রস্তুতি, অন্যদিকে ক্লাস, ইনকোর্স, সেমিস্টার পরীক্ষা, ভাইভা, প্রেজেন্টেশন ও অ্যাসাইনমেন্ট—সবকিছু সামলাতে গিয়ে শিক্ষাজীবনে চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উপস্থিতির হার পূরণ করতে হয়। ফলে শারীরিক অসুস্থতা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামের প্রয়োজন থাকলেও অনেক অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীকে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। সন্তান জন্মের পরও নবজাতকের পরিচর্যা ও মায়ের শারীরিক পুনরুদ্ধারের সময় নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাতৃত্বকালীন সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কোনো একাডেমিক নীতিমালা না থাকায় কেউ সেমিস্টার বা ইয়ার ড্রপ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পর বিশেষ একাডেমিক সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বিশেষ একাডেমিক সুবিধা চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের খবর সামনে এসেছে। তবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এ ধরনের নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অন্তঃসত্ত্বা ও সদ্য মা হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকটা ব্যক্তিগত সমন্বয় ও বিভাগীয় সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী অনন্য মিম বলেন, গর্ভাবস্থায় শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত ক্লাস করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। উপস্থিতি ৭৫ শতাংশের নিচে হওয়ায় প্রতিটি কোর্সে জরিমানা দিতে হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষকদের জানালেও তিনি কোনো ছাড় পাননি বলে দাবি করেন।
তিনি জানান, সন্তান প্রসবের মাত্র ১৭ দিন আগে তাঁর পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল। পরীক্ষা পেছানো না হওয়ায় সন্তান জন্মের ২৪ দিন পর নবজাতককে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হয়েছে।
অনন্য মিম আরও বলেন, ক্যাম্পাসে কমন রুম না থাকায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো বা শান্ত করার জন্য খালি শ্রেণিকক্ষ কিংবা আয়াদের কক্ষের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে উপস্থিতির নিয়মে বিশেষ ছাড় এবং প্রতিটি একাডেমিক ভবনে ডে-কেয়ার কক্ষ স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিহা আফরিন বলেন, সন্তান জন্মের পর শারীরিক দুর্বলতা নিয়েও তাঁকে ক্লাস করতে হয়েছে। গর্ভাবস্থাতেও নিয়মিত ক্লাস করেছেন। তবে সবার সঙ্গে মিডটার্ম পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় পরে আলাদাভাবে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বেবি কেয়ার বা ডে-কেয়ার সুবিধা চালু করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী উপমা রানী বৃষ্টি নিজের শিক্ষাজীবন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন হলেও আবাসিক হলের খাবার তাঁর জন্য সবসময় উপযোগী নয়। চারতলা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামাও তাঁর জন্য কষ্টকর। চিকিৎসক বেশি চলাফেরা ও ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিলেও উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার কারণে নিয়মিত ক্লাসে যেতে হচ্ছে।
উপমা রানী বৃষ্টি বলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে না পারায় সেমিস্টার পরীক্ষায়ও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। পরবর্তীতে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইমপ্রুভ পরীক্ষা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাঁর ডেলিভারির সম্ভাব্য সময়ের সঙ্গে সেমিস্টার পরীক্ষার সময় মিলে যাওয়ায় ইয়ার লসের আশঙ্কাও করছেন তিনি।
তিনি বলেন, অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছুটির ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে। নিজের ক্ষেত্রে যেন ইয়ার লস না হয়, প্রশাসনের কাছে সে ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তিয়াশা চাকমা বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা এমনভাবে করা প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী একাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অন্য শিক্ষার্থীদের কার্যক্রমও ব্যাহত না হয়। একজন শিক্ষার্থীর জন্য পুরো সেমিস্টারের ক্লাস বা পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণের ভিত্তিতে অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ উপস্থিতি বিবেচনার সুযোগ রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
তিয়াশা চাকমার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি লিখিত, সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা থাকা। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের জন্য করণীয় স্পষ্ট হবে এবং মাতৃত্বের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে না পড়েন, সে সুযোগ তৈরি হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মামুন আল রশীদ বলেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ বা আবেদন এলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এমতাজ বলেন, অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিষয়টি জানালে বিভাগ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। বিষয়টি তিনি বিবেচনা করবেন বলে জানান।
মোহাম্মদ সাদ, ইবি প্রতিনিধিঃ 






















