ঢাকা ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

‘অর্থ নয়, চাই ন্যায়বিচার’ মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে সরকারের ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করল হতাহত পরিবারগুলো

সংগৃহীত ছবি।

রাজধানীর উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনায় সরকারের ঘোষিত ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছেন হতাহত ও নিহতদের পরিবার। তারা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়—ন্যায়বিচার, শহীদি মর্যাদা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও স্মৃতিরক্ষাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (তারিখ) ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শোকাহত পরিবারগুলোর পক্ষে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন নিহত শিক্ষার্থী নাজিয়া ও নাফির বাবা আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “গত বছরের ২১ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর শোকাবহ দিন। দুপুর ১টা ১২ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুলের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনায় পাইলটসহ ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন অভিভাবক, তিনজন শিক্ষিকা ও একজন পরিচারিকা নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৭২ জন। “এই দুর্ঘটনায় আমি আমার দুই সন্তানকে হারিয়েছি। কেউ কেউ একমাত্র সন্তান হারিয়ে নিঃসন্তান হয়েছেন, এমনকি কয়েকটি পরিবার সম্পূর্ণ নির্বংশ হয়ে গেছে,”—কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন আশরাফুল ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বারবার সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাবি জানানো হলেও বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রথমে শহীদ পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরিবারগুলো প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে শহীদ পরিবারকে সর্বোচ্চ এক কোটি ও আহতদের সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও ওঠে, সেটিও তারা নাকচ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পরিবারগুলোর মূল দাবি পাঁচ দফা-
প্রথমত, বিমানবাহিনীর ত্রুটি ও গাফিলতিতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে এবং মাইলস্টোন স্কুল ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড না মানায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধানের দুর্নীতির সঙ্গে এই দুর্ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে—সেই দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয়ত, স্কুল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, উচ্চ আদালতের রুল অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ কার্যকর করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো ভবিষ্যতে ন্যূনতম নিরাপত্তা পায়।
পঞ্চমত, নিহতদের শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এক অভিভাবক বলেন, “জীবনের মূল্য কোনো অর্থে পরিমাপ করা যায় না। তবে সন্তানদের নামে কিছু স্থায়ী কাজ হলে অন্তত মনে শান্তি পাওয়া যায়।”

এছাড়া নিহতদের শহীদি সনদ প্রদান, সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত, শহীদদের স্মরণে একটি মনুমেন্ট নির্মাণ, প্রতিবছর ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা, উত্তরা এলাকায় একটি আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং নিহত শিশুদের কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দাবিও জানানো হয়।

হতাহত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, “এই ঘটনায় যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হয়, তবে ভবিষ্যতেও অবহেলা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এমন মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে।”

শোক, ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়—মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে শত শত পরিবার।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘অর্থ নয়, চাই ন্যায়বিচার’ মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে সরকারের ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করল হতাহত পরিবারগুলো

প্রকাশের সময়ঃ ০৬:৩২:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনায় সরকারের ঘোষিত ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করেছেন হতাহত ও নিহতদের পরিবার। তারা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়—ন্যায়বিচার, শহীদি মর্যাদা, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও স্মৃতিরক্ষাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (তারিখ) ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শোকাহত পরিবারগুলোর পক্ষে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন নিহত শিক্ষার্থী নাজিয়া ও নাফির বাবা আশরাফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “গত বছরের ২১ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর শোকাবহ দিন। দুপুর ১টা ১২ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুলের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই শিক্ষাঙ্গন পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনায় পাইলটসহ ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন অভিভাবক, তিনজন শিক্ষিকা ও একজন পরিচারিকা নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৭২ জন। “এই দুর্ঘটনায় আমি আমার দুই সন্তানকে হারিয়েছি। কেউ কেউ একমাত্র সন্তান হারিয়ে নিঃসন্তান হয়েছেন, এমনকি কয়েকটি পরিবার সম্পূর্ণ নির্বংশ হয়ে গেছে,”—কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন আশরাফুল ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বারবার সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাবি জানানো হলেও বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রথমে শহীদ পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরিবারগুলো প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে শহীদ পরিবারকে সর্বোচ্চ এক কোটি ও আহতদের সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও ওঠে, সেটিও তারা নাকচ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পরিবারগুলোর মূল দাবি পাঁচ দফা-
প্রথমত, বিমানবাহিনীর ত্রুটি ও গাফিলতিতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে এবং মাইলস্টোন স্কুল ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড না মানায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধানের দুর্নীতির সঙ্গে এই দুর্ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে—সেই দুর্নীতির অর্থ উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
তৃতীয়ত, স্কুল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, উচ্চ আদালতের রুল অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ কার্যকর করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো ভবিষ্যতে ন্যূনতম নিরাপত্তা পায়।
পঞ্চমত, নিহতদের শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এক অভিভাবক বলেন, “জীবনের মূল্য কোনো অর্থে পরিমাপ করা যায় না। তবে সন্তানদের নামে কিছু স্থায়ী কাজ হলে অন্তত মনে শান্তি পাওয়া যায়।”

এছাড়া নিহতদের শহীদি সনদ প্রদান, সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত, শহীদদের স্মরণে একটি মনুমেন্ট নির্মাণ, প্রতিবছর ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা, উত্তরা এলাকায় একটি আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং নিহত শিশুদের কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দাবিও জানানো হয়।

হতাহত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, “এই ঘটনায় যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হয়, তবে ভবিষ্যতেও অবহেলা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এমন মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে।”

শোক, ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায়—মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে শত শত পরিবার।