
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুইজনকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সোমবার রাতে নগরের শাহ মখদুম থানা পুলিশের একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এদিকে গতকালের ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দিয়ে বিচার দাবি করেছে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। ঘটনার সার্বিক তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস ও মাহমুদুল হাসান।
মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী তৎপরতা সংক্রান্ত পূর্বের একটি মামলায় ওই দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলাটিতে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলে উপস্থিতির তদন্তে তাদের নাম আসামি হিসেবে যুক্ত হয় বলে জানান তিনি। বর্তমানে দুইজনই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর আগে রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীকে সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করার হুমকির অভিযোগ ওঠে একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে। রোববার রাতেই ভুক্তভোগী ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। এরপর প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান তাঁর কার্যালয়ে অভিযুক্ত পক্ষকে ডেকে বৈঠক করেন। বৈঠকে মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। অভিযোগ অস্বীকার করাকে কেন্দ্র করে তারা প্রক্টরের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
সোমবার দুপুরে একই বিষয়ে প্রক্টর দপ্তরে আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তোলেন এবং তার মোবাইলে থাকা কিছু ছবি দেখিয়ে তাকে মারধর করেন। পরিস্থিতি সাময়িকভাবে সামাল দিয়ে সবাইকে দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাকসু কার্যালয়ে গিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর তারা রাকসু ভবন থেকে ধাওয়া খেয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নিলে সেখানেও রাকসু ও শাখা শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর একাধিকবার হামলা চালান। গুরুতর আহত আনাস ও মাহমুদুলকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শিবিরের নেতাকর্মীরা উপাচার্যের দপ্তর ঘেরাও করে অবস্থান নেন। এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে পাল্টা প্রতিবাদ জানায় শাখা ছাত্রদল।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি গঠনের পরপরই দুপুর সাড়ে ১২টায় সদস্যরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম-২কে আহ্বায়ক করে গঠিত এই কমিটিতে আরও রয়েছেন ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছাদিক, ম্যাটেরিয়ালস্ সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাদুল হক, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম এবং ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এ নাঈম ফারুকী।
ঘটনার পর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের আলোচিত পাঠকক্ষটি বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে যেখানে অর্ধশতাধিক চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করেন, আজ তারা এসেও ফিরে গেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাভাবিক দিনের মতো সকালে শিক্ষার্থীরা ব্যাগ রেখে সিরিয়াল দিলেও পাঠকক্ষ না খোলার সিদ্ধান্ত জানতে পেরে কেউ পাশের কক্ষে, আবার কেউ দোতলার ডিসকাশন রুমে গিয়ে পড়াশোনা করেন।
প্রক্টরের কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে মারধরের এই ঘটনাকে ‘মব ভায়োলেন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছে ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। একইসঙ্গে রাকসু ভবনে হামলার ঘটনারও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে সংগঠনটি। জোটের আহ্বায়ক নাসিম সরকারের পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে শাখা ছাত্রদলও।
মারধরের ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে। এ সময় সংগঠনটির সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, লাইব্রেরি ও ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ স্থান হওয়া উচিত, অথচ সেখানেই হামলার ঘটনা ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রক্টরের কার্যালয়েই প্রথম হামলার সূত্রপাত হয়। তিনি প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের বিবৃতিতে বলা হয়, রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই তিন শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, যা কোনো সুস্থ ক্যাম্পাস পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কোনো অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার কোনো ছাত্র সংগঠনের নেই। এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত নিরাপদ ক্যাম্পাসের ধারণাকে ক্ষুণ্ন করছে বলে মন্তব্য করা হয়।
এ ঘটনায় জোটের পক্ষ থেকে দুটি দাবি জানানো হয়েছে— প্রথমত, রাকসু ভবনে হামলা ও মব ভায়োলেন্সের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারসহ পুরো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
সৈয়দ মাসুদ, রাজশাহী 





















