
রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহ-আয়োজক ও অন্যান্য অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা তীব্র বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে।
তিনি রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ করা, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় বড় স্রোত এসেছে। ১৯৮০-এর দশকেও দেশটি রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে এবং তৎকালীন সরকারগুলোর সময় কিছু রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনও ঘটেছিল। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়।
তিনি বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, আর মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে সেখান থেকে এখনো মানুষ পালিয়ে আসছে।
তারেক রহমান জানান, শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটি নতুন প্রজন্ম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা বেড়ে উঠছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে এবং প্রবীণরা ফেলে আসা ঘরবাড়ির স্মৃতি বুকে ধরে নিজভূমে ফেরার আকুতি পোষণ করছেন।
মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাখাইনে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ শিবিরের পরিবেশ উন্নত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও এসব শিবির দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য উপযোগী কোনো স্থান নয়।
দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের প্রভাব শুধু রোহিঙ্গাদের ওপরই পড়ছে না, বরং কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীও এর তীব্র প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে মানব ও অভিবাসী পাচার, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এমনকি অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করছেন বলেও জানান তিনি। তার মতে, একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন যত বাড়ছে, সহায়তার পরিমাণ ততই কমছে। তিনি জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
তিনি বলেন, এই প্রবণতা চলতে দেওয়া যায় না এবং বাংলাদেশের পাশে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এখন আগের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না, এবং অনির্দিষ্টকাল ধরে কেবল বাংলাদেশই এই দায়ভার বহন করবে—এমন প্রত্যাশাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি স্পষ্ট করেন, রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে, এবং এর টেকসই সমাধানও নিহিত সেখানেই।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। তিনি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ কারণে এখনও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানান, শুধু সহমর্মিতা প্রকাশ না করে এখন সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে—প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এর প্রকৃত অবসানের দিকে।
অধিকার ডেস্কঃ 























