
মেধা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতিতে উৎসবমুখর হয়ে উঠল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাঙ্গন। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী জেলার ১ হাজার ২০০-এর বেশি কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদ। তবে শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদযাপনের এ আয়োজনে শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পাশাপাশি উঠে এসেছে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট, অতীতের সরকারের নীতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) মাঠে জেলা পরিষদের আয়োজনে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বারী বলেন, “ফ্যাসিস্ট ও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতির কারণেই দেশে আজ জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।”
প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও অতিথিদের সামনে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করে।
জ্বালানি সংকটের জন্য অতীত ও অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিকে দায়ী করলেন প্রতিমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, অতীতের ফ্যাসিস্ট সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতির কারণেই দেশে বর্তমানে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ছেলেদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে শিক্ষা বিস্তার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তবে জ্বালানি সংকটের পেছনে কোন কোন নীতি কীভাবে ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষিভিত্তিক জোন গড়ার পরিকল্পনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষি সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ এলাকায় কৃষিভিত্তিক জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী উত্তরাঞ্চলে থাকা কৃষিভিত্তিক জোনগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায় এবং উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা যায়, সে বিষয়ে একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন।
কৃষিভিত্তিক এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি কার্যক্রমের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতিতে কৃষিপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি এ পরিকল্পনার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১২০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর সাফল্যে উৎসবমুখর আয়োজন
জেলা পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে আরও ভালো ফলাফল অর্জনে উৎসাহিত করা এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, অভিভাবকদের আনন্দ এবং শিক্ষকদের গর্বিত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় প্রাণবন্ত পরিবেশ। দীর্ঘ অধ্যবসায়, নিয়মিত পড়াশোনা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় আনন্দ ও উদ্দীপনা।
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী দিনে আরও বড় সাফল্য অর্জনে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের আহ্বান
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন একজন শিক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব।
তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বাস্তবজ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ তৈরিতে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ, জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সালেহ মোহাম্মদ হাসনাত, ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ আফজাল রাজন।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
মেধার স্বীকৃতি থেকে উন্নয়নের প্রত্যাশা
জেলার ১ হাজার ২০০-এর বেশি জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সংবর্ধনা শিক্ষাঙ্গনে মেধার স্বীকৃতি ও সাফল্য উদযাপনের একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন হিসেবে উঠে এসেছে।
একদিকে কৃতী শিক্ষার্থীদের অর্জনকে সম্মান জানানো, অন্যদিকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি সংকট এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অনুষ্ঠানের আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে আরও বড় সাফল্য অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ আয়োজন। জেলার শিক্ষাঙ্গনে মেধার মূল্যায়ন ও নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ই ছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মূল বার্তা।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 























