
ভালোবাসা একটি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও শুধু ভালোবাসা থাকলেই সম্পর্ক সব সময় সুন্দর থাকে না। সময়ের সঙ্গে মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, অর্থনৈতিক চাপ, ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন কিংবা ব্যক্তিগত চাহিদাকে ঘিরে দম্পতিদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। একই বিষয় নিয়ে বারবার মতবিরোধ হলে সেই দূরত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মতবিরোধ হওয়া মানেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া নয়। বরং সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সমস্যা নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করার অভ্যাস সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে।
গবেষণাতেও দেখা গেছে, সুখী কিংবা অসুখী—উভয় ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। পার্থক্যটা মূলত তৈরি হয় মতবিরোধের সময় তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করেন এবং সমস্যা কীভাবে সামলান, তার ওপর।
যে বিষয়গুলো নিয়ে বারবার মতবিরোধ হয়
সম্পর্কের শুরুতেই যদি ঘরের কাজ, থালা-বাসন পরিষ্কার কিংবা দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে ঝামেলা হয়, ভবিষ্যতেও একই ধরনের বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দম্পতিদের মধ্যে যেসব বিষয় নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়, তার অনেকগুলোই দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্কের অংশ হয়ে থাকে। এসব সমস্যাকে অনেক সময় ‘চিরস্থায়ী’ বা ‘অমীমাংসিত’ সমস্যা বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের দ্য গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোলের মতে, অর্থনৈতিক বিষয়, সন্তান লালন-পালন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কিংবা সংসারের কাজ ভাগ করে নেওয়ার মতো বিষয় এসব বিরোধের কারণ হতে পারে। এমনকি ঘর পরিষ্কার রাখার মতো দৈনন্দিন বিষয়ও দম্পতিদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মতবিরোধের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মতবিরোধ থাকলেই সম্পর্ক খারাপ নয়
একটি সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। সঙ্গীর প্রয়োজন ও অনুভূতি বোঝার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই তর্ক হচ্ছে বলেই সম্পর্ক অসুখী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
সুখী ও অসুখী উভয় ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁরা সেই পরিস্থিতিতে পরস্পরের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকছেন এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন কি না।
গঠনমূলক আলোচনায় একে অপরের মতামতের প্রতি সম্মান, কৌতূহল ও সহমর্মিতা থাকে। এভাবে মতবিরোধ সামলাতে পারলে তা অনেক সময় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর চার আচরণ
ক্যারি কোল সম্পর্কের ক্ষেত্রে চার ধরনের আচরণকে বিশেষভাবে ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো—অতিরিক্ত সমালোচনা, অবজ্ঞা, আত্মরক্ষামূলক আচরণ এবং ‘স্টোনওয়ালিং’ বা আলোচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
এসব আচরণ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনভাবে আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করলে এই ধরনের নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
সঙ্গীর প্রতি ক্রমাগত সমালোচনা, আক্রমণাত্মক মনোভাব কিংবা বৈরী আচরণ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এসব আচরণ দাম্পত্য কলহ বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকির সঙ্গেও যুক্ত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন
সম্পর্ক ভালো রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঙ্গীর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দেওয়া। অর্থাৎ, একজন মানুষ যেন অনুভব করেন—তার সঙ্গী তার কথা শুনছেন, অনুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।
ইতিবাচক সাড়া পাওয়া দাম্পত্য সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিবাহিত দম্পতিদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঘরের কাজ ভাগাভাগি করার সঙ্গে বেশি দাম্পত্য সুখ ও কম মতবিরোধের সম্পর্ক রয়েছে।
দম্পতিদের তর্কের ধরন তাঁদের ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ধ্বংসাত্মক ও উত্তেজনাপূর্ণ তর্ক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিপরীতে শান্ত ও গঠনমূলক আলোচনা পরিস্থিতি সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
থেরাপির মাধ্যমে ফিরতে পারে সহমর্মিতা
সম্পর্কে দীর্ঘদিনের তিক্ততা তৈরি হলে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন হলে দম্পতি থেরাপি সম্পর্কের যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষণায় দম্পতি থেরাপির ইতিবাচক প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে। সম্পর্কের সমস্যা সমাধান, দাম্পত্য সন্তুষ্টি বৃদ্ধি, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে থেরাপি সহায়ক হতে পারে।
ইলিনয়ের ইভান্সটনে অবস্থিত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ও কাপল থেরাপিস্ট জে লেবোর মতে, সম্পর্কের সংকটে থাকা অনেক দম্পতির মধ্যেই পারস্পরিক সহমর্মিতা কমে যায়। তাই থেরাপির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে সেই সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনা।
এ ক্ষেত্রে ‘আমার সঙ্গীর সমস্যা কী?’—এমন প্রশ্নের বদলে ‘আমাদের মধ্যে কী ঘটছে?’—এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিস্থিতিকে দেখার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
‘আরও বলুন’—এই অভ্যাসও কাজে দিতে পারে
ক্যারি কোলের মতে, একজন সঙ্গী যখন অন্যজনের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি কেন তোমার এমন মনে হচ্ছে’, তখন সেটি সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক সংকেত হতে পারে।
এখানে একমত হওয়াই একমাত্র বিষয় নয়। বরং সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার আগ্রহ থাকাটাই গুরুত্বপূর্ণ। মতের মিল না থাকলেও ‘এ বিষয়ে আমাকে আরও বলুন’ কিংবা ‘আপনার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?’—এ ধরনের প্রশ্ন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সঙ্গীর কথা জানার প্রতি কৌতূহল থাকলে ভুল বোঝাবুঝি কমানোর পাশাপাশি পারস্পরিক বোঝাপড়াও বাড়তে পারে।
দুজনের আগ্রহ ও চেষ্টা প্রয়োজন
জে লেবোর মতে, সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে দম্পতিদের নিজেদের আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু থেরাপিস্টের ওপর নির্ভর করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে—এমন নয়।
দুজনেই যদি সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন এবং নিজেদের আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ বাড়ে। তাই সম্পর্ক ভালো রাখার দায়িত্ব শুধু একজনের নয়; উভয়ের অংশগ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ।
আলাদা হওয়ার সময়ও থেরাপি সহায়ক হতে পারে
যেসব দম্পতি আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরাও প্রয়োজনে কাপল থেরাপির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। বিচ্ছেদের সময় পারস্পরিক তিক্ততা কমানো, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সন্তান থাকলে তাঁদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।
লেবোর মতে, সম্পর্কের বিচ্ছেদ অত্যন্ত কঠিন অভিজ্ঞতা হলেও এ সময় নিজের আচরণ, প্রয়োজন ও সম্পর্কের ধরন সম্পর্কে শেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সহমর্মিতা দেখানোর মতো দক্ষতা শুধু সংকটে থাকা দম্পতিদের জন্য নয়, সুস্থ সম্পর্ককেও আরও ভালো রাখতে কাজে লাগে।
সব মিলিয়ে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার অভ্যাস। মতবিরোধ একটি সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ হতে পারে; তবে সেই মতবিরোধ কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই সম্পর্কের মান ও স্থায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অধিকার ডেস্কঃ 
























