
চাচাতো বোনের কোল থেকে হঠাৎ ছিনিয়ে নেওয়া মাত্র ১১ মাসের শিশু নাফিজ হোসেনকে ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে তৈরি হয়েছিল গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। পরিবারের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন হয়ে উঠেছিল অসহনীয়। কোথায় আছে ছোট্ট নাফিজ, কার কাছে আছে, কী অবস্থায় আছে—এসব প্রশ্নে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল তার পরিবার।
অবশেষে অপহরণের প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর শিশুটিকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার পেছনের গল্প প্রচলিত অর্থে অর্থের লোভ, মুক্তিপণ কিংবা শিশুপাচারের কোনো উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পুলিশের দাবি, নিজেদের সন্তান না থাকায় একটি শিশুকে লালন-পালনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই নাফিজকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ হিসেবে একটি শিশুকে তার পরিবারের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগই এখন ওই দম্পতিকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস।
কোলের শিশুকে মুহূর্তেই ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া শিশু নাফিজ হোসেন শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের হাজারবিঘী গ্রামের রুবেল হোসেনের ছেলে।
ঘটনার দিন সোমবার দুপুরে নাফিজকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় একটি বাজারে গিয়েছিলেন তার চাচাতো বোন শিরিন খাতুন। সেখানেই ঘটে আকস্মিক ঘটনা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বোরকা পরিহিত অবস্থায় সেখানে যান সুজিআরা বেগম। একপর্যায়ে তিনি শিরিন খাতুনের কোল থেকে জোর করে শিশুটিকে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এক মুহূর্তে পরিবারের আদরের শিশুটি চোখের আড়ালে চলে যাওয়ায় স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে উৎকণ্ঠা। শিশুটিকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, তার নিরাপত্তা কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করে পরিবার।
পরে নাফিজের বাবা শিবগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলার পর শিশুটিকে উদ্ধারে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
সিসিটিভি ও প্রযুক্তির সূত্র ধরে এগোয় তদন্ত মামলার পর ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়।
পুলিশের দাবি, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্তের একপর্যায়ে শিশুটিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শিবতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাখা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়।
এরপর মঙ্গলবার রাতে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে ১১ মাসের শিশু নাফিজ হোসেনকে উদ্ধার করা হয়। একই সময় শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মো. মানিকুজ্জামান ও তার স্ত্রী সুজিআরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর শিশুটিকে ফিরে পাওয়ায় স্বস্তি ফেরে পরিবারের মধ্যে।
‘সন্তানের আকাঙ্ক্ষা’—পুলিশের বর্ণনায় ভিন্ন এক পটভূমি
পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গ্রেপ্তার মানিকুজ্জামান ও সুজিআরা বেগম উভয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছিলেন। কিন্তু তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তান না থাকার কারণে নিজেদের একটি সন্তান লালন-পালনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় ওই দম্পতির মধ্যে। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তারা নাফিজকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়া, মুক্তিপণ আদায় কিংবা পাচারের উদ্দেশ্যের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে শিশুটিকে তার পরিবারের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিই গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আবেগের গল্প হলেও আইনের চোখে অপরাধ
ঘটনার পেছনে আবেগ বা সন্তান লালন-পালনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি থাকলেও আইন নিজের গতিতেই চলবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ভুক্তভোগী শিশু হওয়ায় ঘটনাটি ‘মানুষ অপহরণ’ হিসেবে বিবেচিত এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
অর্থাৎ, একটি শিশুকে ভালোবাসা, লালন-পালন কিংবা সন্তান হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তার বৈধ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া তাকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আইনগতভাবে বৈধতা পায় না।
৩৬ ঘণ্টার আতঙ্কের অবসান
মাত্র ১১ মাস বয়সী একটি শিশু। নিজের পৃথিবী বলতে যে শিশুটির কাছে মা-বাবা, স্বজন আর পরিচিত মুখগুলোই সব—সেই শিশুটিই হঠাৎ পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
নাফিজের স্বজনদের কাছে ৩৬ ঘণ্টা যেন ৩৬ বছরের মতো দীর্ঘ হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি ফোনকল, প্রতিটি অচেনা খবর, প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়া—সবকিছুর মধ্যেই ছিল শিশুটিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি।
শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। শিশুটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনা আবারও সামনে আনল একটি কঠিন বাস্তবতা—সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যতই তীব্র হোক, অন্যের সন্তানকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার কোনো আইনগত পথ নেই।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 























