
ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রাজারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নয়াটোলা ও হরিপুর নতুনপাড়া এলাকায় এ অভিযান চালায় পৌরসভার টিম-৪।
অভিযানে জলাধার, বাড়ির আঙিনা, গলি, খোলা জায়গা ও আশপাশের পরিবেশ ঘুরে দেখা হয়। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি অপসারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে সচেতন করা হয়।
পৌরসভার মাঠপর্যায়ের এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটসের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশক নিধন নয়, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করাই ছিল অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য রাজারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নয়াটোলা ও হরিপুর নতুনপাড়া এলাকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন টিম-৪-এর সদস্যরা।
বাড়ির আশপাশ, জলাধার, গলি, খোলা জায়গা ও বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। যেখানে জমে থাকা পানি পাওয়া যায়, সেসব স্থান থেকে পানি সরিয়ে ফেলা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভবিষ্যতে যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।
জলাধারে জমা বৃষ্টির পানি অপসারণ
অভিযান চলাকালে কয়েকটি জলাধারে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। পৌরসভার টিম-৪-এর সদস্যরা এসব জলাধারে জমে থাকা পানি অপসারণ করেন। জলাধারের মালিকপক্ষকে নিয়মিত পানি ও আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণের পরামর্শও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিদর্শনের সময় জলাধারের আশপাশে কিছু মশা উড়তে দেখা গেলেও মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে কোনো স্থানে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে তা মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই জলাধার, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা কিংবা খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাড়ির আঙিনা থেকে গলি—কোথাও পানি জমছে কি না নজর
অভিযানের অংশ হিসেবে বাড়িঘরের আশপাশ, গলি, খোলা জায়গা ও বিভিন্ন স্থাপনার চারপাশে পানি জমার সম্ভাব্য স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু বড় জলাধার পরিষ্কার করলেই হবে না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, ক্যান, প্লাস্টিকের বোতল, পরিত্যক্ত সামগ্রী কিংবা নির্মাণসামগ্রীর আশপাশেও পানি জমে থাকতে পারে। এসব ছোট ছোট স্থানও নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
বিশেষ করে বৃষ্টির পর বাড়ি ও আশপাশে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

লিফলেট বিতরণ, সচেতনতার বার্তা
অভিযান চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়। পৌরসভার প্রচারণায় ‘বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করি, করিব ডেঙ্গু প্রতিকার’—এমন বার্তার মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
স্থানীয়দের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে ছাদ, বারান্দা, বাগান, ফুলের টব ও পানির পাত্র নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পানি জমতে পারে এমন পরিত্যক্ত পাত্র ও প্লাস্টিক সামগ্রীও সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সচেতন করা হয়।
রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসের সদস্যদের অংশগ্রহণ
পৌরসভার টিম-৪-এর এ মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসের সদস্যরা অংশ নেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন জেলা গণপূর্ত দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার দেব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মো. ইমরান হোসাইন এবং দৈনিক চাঁপাই দর্পণের প্রতিনিধি মো. ইসাহাক আলী।
এ ছাড়া পৌরসভার অফিস সহকারী মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বিল ক্লার্ক মো. সেরাজুল ইসলাম, ইউসুফ, ফয়সাল, মেহেদী, আরাফাত ও আফজালসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
রেড ক্রিসেন্টের সদস্য মোসাঃ তানজিলা খাতুন, মোঃ এ্যানি খাতুন ও মোসাঃ খুসি আরা খাতুনসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সপ্তাহে এক দিন বাড়িতেই নজরদারির আহ্বান
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু পৌরসভার অভিযান নয়, নাগরিকদের নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিয়েছেন, সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, জলাধার এবং আশপাশের খোলা জায়গা ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
পাশাপাশি পরিত্যক্ত বোতল, ক্যান, প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা ও পানি ধরে রাখতে পারে—এমন সামগ্রী খোলা জায়গায় ফেলে না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, প্রজননস্থল বন্ধে জোর
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিম-৪-এর এই অভিযান থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি বিষয়ই সামনে এসেছে—শুধু মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; মশার বংশবিস্তারের সম্ভাব্য স্থানও নিয়মিত চিহ্নিত ও পরিষ্কার করতে হবে।
জলাধার, বাড়ির ছাদ, ফুলের টব কিংবা পরিত্যক্ত পাত্র—যেখানেই পানি জমার সুযোগ রয়েছে, সেখানেই নজরদারি বাড়াতে হবে। বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে মশার প্রজননের সম্ভাব্য সুযোগ কমানো সম্ভব।
বছরজুড়ে পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধকে কেবল মৌসুমি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও নজরদারির অংশ করা প্রয়োজন। পৌরসভার পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও পরিষ্কার করার পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ এলাকার পরিচ্ছন্নতায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
রাজারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নয়াটোলা ও হরিপুর নতুনপাড়া এলাকায় টিম-৪-এর এ অভিযান সেই ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ। নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ, জলাধার পরিষ্কার রাখা, পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা এবং বাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা না করে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখাই হতে পারে কার্যকর প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 





















