
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের ভয়াবহতা যেন দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। শিশুদের একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মাঝে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মমেক হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডগুলোতে হাম ও হামের জটিলতায় আক্রান্ত মোট ৬২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন শিশু এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৯ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৬০৯ জন রোগী মমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৫০৮ জন। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৯ জন, যাদের বেশিরভাগই শিশু।
সর্বশেষ মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজন ময়মনসিংহের দাপুনিয়া এলাকার ৬ মাস বয়সী শিশু ছেলে। গত ১৯ মে রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটি নিউমোনিয়া ও হার্ট ফেইলিউরসহ হামের জটিল উপসর্গে ভুগছিল।
অপরদিকে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার দেওথান এলাকার ১০ মাস বয়সী আরেক শিশু মঙ্গলবার (২৬ মে) ভোরে মারা যায়। গত ২০ মে সকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি নিউমোনিয়া, তীব্র রক্তস্বল্পতা এবং হার্ট ফেইলিউরসহ গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত ছিল।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, উদ্বিগ্ন স্বজনদের ভিড়ে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ছোট ছোট শিশুদের কাশি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টে কাতরাতে দেখা গেছে। অনেক পরিবার দূর-দূরান্ত থেকে সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসছেন শেষ আশ্রয়ের আশায়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন,
“হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই শেষ মুহূর্তে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হচ্ছে। অনেকের নিউমোনিয়া, তীব্র রক্তস্বল্পতা কিংবা হার্ট ফেইলিউরের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন, কিন্তু অবস্থা জটিল হয়ে গেলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, শিশুদের শরীরে হাম বা জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দেরি না করে হাসপাতালে আনলে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে অনীহা, অসচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না নেওয়ার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তারা শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
এদিকে, হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসক ও নার্সদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। শিশুদের একের পর এক মৃত্যুতে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয়েছে শোকাবহ পরিবেশ।
শফিয়েল আলম সুমন , ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 

















