
একটি পরীক্ষার দিন মানেই নতুন স্বপ্নের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বহু বছরের পরিশ্রম, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, পরিবারের অগাধ প্রত্যাশা আর নিজের ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলার লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা। কিন্তু সেই স্বপ্নের সকালই যখন শেষ সকালের নাম হয়ে যায়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়—স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো সমাজ।
ময়মনসিংহে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার দিন ভোরে তিশা সরকার (১৮) নামে এক পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে হাতে কিছুক্ষণ পর কলম ওঠার কথা ছিল, সেই হাতই চিরদিনের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আর যে পরিবার মেয়ের সাফল্যের অপেক্ষায় ছিল, তারা এখন বুকভরা কান্না আর অজস্র প্রশ্ন নিয়ে দিন গুনছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভোর প্রায় ৬টার দিকে নগরীর কাচিঝুলী মসজিদ রোড এলাকার নাসা টাওয়ার নামে একটি বহুতল ভবনের নিচে গুরুতর আহত অবস্থায় তিশাকে পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। দ্রুত উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত তিশা সরকার ময়মনসিংহ নগরীর মিন্টু কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাড়ি জেলার তারাকান্দা উপজেলার মধ্য বাজার এলাকায়। বাবা উত্তম সরকার ও মা মনি সরকারের একমাত্র স্বপ্ন ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে প্রায় দুই বছর ধরে শহরের কাচিঝুলী এলাকায় একটি ছাত্রী মেসে থেকে পড়াশোনা করছিলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তিশা ছিলেন শান্ত, মেধাবী ও পরিশ্রমী। এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে তাঁরও ছিল নানা পরিকল্পনা। উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সব স্বপ্ন যেন থেমে গেল নির্মম বাস্তবতায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টায় এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোরেই ঘটনাটি ঘটে। মেসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা জানান, তখন সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে ঠিক কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
খবর পেয়ে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) আশরাফুল করিম বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তবে এটি কীভাবে ঘটেছে এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঘটনার প্রতিটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে তিশার মৃত্যুতে সহপাঠী, শিক্ষক এবং স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই শোক প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে থাকলেও কোনো ঘটনার কারণ সম্পর্কে তদন্তের আগে অনুমান বা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তিশার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি একটি স্বপ্নের আকস্মিক সমাপ্তি, যা সমাজকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। যে সকালে তার পরীক্ষার হলে বসার কথা ছিল, সেই সকালই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ অধ্যায়।
এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের দিকে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেই জানা যাবে, কীভাবে থেমে গেল এক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর জীবন। তবে এরই মধ্যে তিশার অকালপ্রয়াণ সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা কি যথেষ্ট মনোযোগী?
শফিয়েল আলম সুমন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 
















