
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মারধর, হেনস্তা ও কক্ষ ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল (১৫ আগস্ট) শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ছাত্রদল। এ সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাসে না আসারও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রশাসন ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কয়েকটি বিভাগ ও টিএসসিসিতে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মারধর, হেনস্তা ও কক্ষ ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা ফেসবুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দুই শিক্ষক ও তিন কর্মকর্তাকে মারধর, হেনস্তা এবং তাদের কক্ষ ও অফিসে ভাঙচুর করে।
দুপুর ১ টার দিকে প্রশাসন ভবনের সংস্থাপন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ইব্রাহিম হোসেন সোনার কক্ষে গিয়ে ভাঙচুর ও তাকে হেনস্তা করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের শাখা কর্মকর্তা টিটুল আহমেদকে হুমকি ও মারধরের চেষ্টা করা হয়।
এরপর টিএসসিসির সহকারী রেজিস্ট্রার বিপুল আহমেদের কক্ষে গিয়ে তাকে মারধর ও টেবিল ভাঙচুর করা হয়। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক শহিদুল ইসলামকে তার কক্ষে হুমকি দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হলে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীও হেনস্তার করে তারা।
একপরে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের কক্ষে গিয়ে তাকে হুমকি ও হেনস্তা করা হয়। এ সময় তার টেবিল ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুর করা হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাসে না আসারও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদ তৌফিক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সদস্য রেজাউল ইসলাম রাকিব, আব্দুল্লাহ আল নোমান, শাহরিয়ার রশিদ নিলয় ও খালেদ সাইফুল্লাহ, কর্মী রাহি, সাবিক, উল্লাস মাহমুদ, নাঈম, সিজান ও সাগর আলী এবং কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক
মুক্তাদির আহমেদসহ প্রায় ২৫ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।
হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. উম্মে সালমা লুনা বলেন, ‘আমার কক্ষে এসে তারা যে ঘটনা ঘটিয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। একজন শিক্ষকের কক্ষে এসে এ ধরনের আচরণ করা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। শুধু আমার কক্ষেই নয়, যাওয়ার সময় তারা আমার কয়েকজন শিক্ষার্থীকেও মারধর করেছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশা করছি।’
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের শাখা কর্মকর্তা টিটুল আহমেদ বলেন, ‘দুপুরের সময় আমি অফিসে বসে ছিলাম। হঠাৎ তারা আমার অফিসে এসে জানতে চায়, মুজিবের মৃত্যুবার্ষিকীতে শোক জানিয়ে কেন ফেসবুকে পোস্ট করেছি। এরপর তারা আমাকে আর ক্যাম্পাসে না আসার জন্য হুমকি দেয়। একপর্যায়ে তারা আমার দিকে একটি প্লেট ছুড়ে মারে এবং আমাকে মারধরের জন্য উদ্যত হয়। পরে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে তারা সেখান থেকে চলে যায়।’
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ বিষয়ে ভালো জানেন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ‘গতকাল ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগকে নিয়ে পোস্ট করে শান্ত ক্যাম্পাসকে অশান্ত করার চেষ্টা করেছেন। তা রুখে দিতে ছাত্রদল সবসময়ই প্রস্তুত আছে। যেগুলো আমাদের নজরে এসেছে, আমরা সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের বিষয়ে প্রয়োজনে আমরা আইন হাতে তুলে নেব। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমাদেরই আইন হাতে তুলে নিতে হবে।’
এবিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে মিটিং করছি। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে ডেকে কথা বলেছি। তারা বিষয়টিতে ভুল স্বীকার করেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে তারা এ ধরনের কাজ করবে না। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য আইন রয়েছে। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কোনো ব্যক্তি বা ছাত্রসংগঠন শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ব্যানারে কেউ পোস্ট দিয়ে থাকলে, তা প্রমাণিত হলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইবি প্রতিনিধিঃ 
























