
সাতক্ষীরা ফেরার পথে যেন থমকে গেল সময়। কফিনবন্দি হয়ে নিজ গ্রামের মাটিতে শেষবারের মতো ফিরলেন লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত দুই প্রবাসী—শফিকুল ইসলাম (৪০) ও নাহিদুল ইসলাম (২০)। রোববার সকালে তাদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছালে পুরো এলাকায় নেমে আসে এক হৃদয়বিদারক শোকের ছায়া।
গ্রামের পথে পথে মানুষের ঢল নামে। শত শত স্বজন, প্রতিবেশী ও সাধারণ মানুষ শেষবারের মতো প্রিয় মুখ দুটিকে দেখতে ভিড় করেন। কান্নার রোল, নিস্তব্ধ আকাশ আর ভারী বাতাস—সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে বেদনাবিধুর ও স্তব্ধ করা এক শোকগাথা।
এর আগে শনিবার গভীর রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের মরদেহ এসে পৌঁছায়। সেখানে সরকারি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মরদেহ গ্রহণ করা হয় এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা দুই প্রবাসীর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে অবস্থানকালে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম। দীর্ঘ ২৭ দিন পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু জানান, জানাজা শেষে গতকাল জোহরের নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। পুরো এলাকায় তখন নেমে আসে গভীর শোকের আবহ।
শফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তার পরিবার। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে রেখে তার এমন নির্মম বিদায় যেন পরিবারটির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা।
নিহত শফিকুলের বাবা আফসার আলী বলেন, সংসারের স্বচ্ছলতার আশায় ঋণ করে ছেলে বিদেশে গিয়েছিল। এখন তার নিথর দেহ ফিরে এসেছে—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
অন্যদিকে নাহিদুল ইসলামের বাবা আব্দুল কাদের জানান, অভাবের তাড়নায় সংসারের স্বপ্ন পূরণে ঋণ নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে গেছে চিরতরে।
খুলনা প্রবাসীকল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবন বীমা বাবদ ১০ লাখ টাকা করে মোট ১৩ লাখ টাকা করে সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই দুই প্রবাসীর মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই এক গভীর শোকের স্মৃতি হয়ে রইল—যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনে বেদনার দাগ এঁকে রাখবে।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 

















