
রাজশাহীতে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এইচআইভি সংক্রমণের হার। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত শুধু রাজশাহী জেলায় মোট ১৩৯ জন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অনিরাপদ যৌন আচরণ, সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক লজ্জা এবং রোগ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। একইসাথে আক্রান্তদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসা গ্রহণে বাধা তৈরি করছে।
রামেক হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৮৫২ জন এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৫ জনের দেহে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১০৫ জন পুরুষ, ৯ জন নারী এবং ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি রয়েছেন।
বৈবাহিক অবস্থার হিসাবে ৪৮ জন বিবাহিত এবং ৬৭ জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন এতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪ জন প্রবাসফেরত ব্যক্তিও শনাক্তদের তালিকায় রয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর তথ্যে দেখা যায়, শনাক্তদের মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ যারা পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক রেখেছেন, ৩৫ জন যৌনকর্মীর সংস্পর্শে এসেছিলেন, ২ জন যক্ষ্মা রোগী, ১ জন যৌনকর্মী, ২ জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি এবং ১৪ জন সাধারণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে হাসপাতালের বাইরে চিহ্নিত হওয়া আরও ৩৪ জন আক্রান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে, যাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বিভাগের আট জেলায় মোট ৭৯৪ জন এইচআইভি আক্রান্ত রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১০ জন সিরাজগঞ্জে। অন্যান্য জেলার মধ্যে রাজশাহীতে ১৩১ জন, বগুড়ায় ১০৯ জন, পাবনায় ৭৮ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন আক্রান্ত রয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি জানান, এইচআইভি শুধু যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেই ছড়ায় না — পরীক্ষাবিহীন রক্ত গ্রহণ, একাধিক ব্যক্তির একই সিরিঞ্জ ব্যবহার, মাদকসেবনে সুঁচ ভাগাভাগি এবং আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যেও এ ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। তাই প্রতিরোধ ও সচেতনতাই এখন সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি এখনো পরিবার ও সমাজে নেতিবাচক আচরণের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, “এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যৌন সংক্রমণ — এ ধারণা সঠিক নয়। বিভিন্ন কারণে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করছে, তবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোও সমান জরুরি।”
বারিন্দ কলেজ অব নার্সিং সায়েন্সেসের শিক্ষার্থী মাহাফুজা রাহাত বুশরা বলেন, “এইচআইভি কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক বিষয়ও। সচেতনতার অভাব, ভুল তথ্য এবং সামাজিক কুসংস্কার অনেককে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।”
গত বছরের ডিসেম্বরে রামেক হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হয়েছে। তবে আগে থেকে শনাক্ত অনেক রোগীর চিকিৎসা ফাইল এখনো বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে থাকায় তাদের ওষুধ সংগ্রহ ও ফলোআপের জন্য বগুড়ায় যেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের ফোকাল পার্সন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, “শনাক্ত হওয়াটা নিজেই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কারণ এতে আক্রান্তরা চিকিৎসার আওতায় আসেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।” তিনি আরও জানান, ধাপে ধাপে রোগীদের ফাইল রাজশাহীতে স্থানান্তর করা হচ্ছে এবং অচিরেই সব রোগী রাজশাহী থেকেই পূর্ণাঙ্গ সেবা পাবেন।
সৈয়দ মাসুদ রাজশাহী 




















