ঢাকা ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ সশস্ত্র আনসার মোতায়েন বীরমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি রাজশাহীতে শুরু হলো এইচএসসি পরীক্ষা, অংশ নিচ্ছে সোয়া লাখের বেশি শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার সকালেই নিভে গেল তিশার স্বপ্ন-এক মৃত্যুর শোক, হাজার প্রশ্নের ভার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শুরু এইচএসসি পরীক্ষা, কারাগার থেকে পরীক্ষা দিলেন এক শিক্ষার্থী খেলা দেখা নিয়ে বিরোধ, সালিশ শেষে হামলায় বিএনপি নেতা নিহত লক্ষ্মীপুর থানার ওসি প্রত্যাহার বরিশালে ভূমি অফিসে অনিয়মের প্রমাণ, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি বেরোবির ৪ মেধাবী নারী শিক্ষার্থী পেলেন ‘হাসনা ইলাহি মেমোরিয়াল স্কলারশিপ’ যুবদল নেতার চেম্বারে চার যুবককে নির্যাতনের অভিযোগ, ভিডিও ছড়িয়ে তোলপাড়

সরকারি প্রকল্পের আড়ালে মহানন্দা ‘লুট’! টিপু চেয়ারম্যানের বালু-মাটি কাণ্ডে হুমকিতে বাঁধ-জনপদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর কিনার থেকে ট্রাক্টরের মাধ্যমে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। কাবিখা প্রকল্পে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নদী থেকে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে গোবরাতলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।

নিয়ম-নীতি ও পরিবেশ সুরক্ষা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর তলদেশ ও নদী রক্ষা বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রকাশ্যে বালু-মাটি কেটে সরকারি প্রকল্পে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর খোদ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, কাবিখা প্রকল্পের রাস্তার ভরাটের জন্য বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে মাটি না কিনে নদীর কিনার থেকেই বালু-মাটি তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে মহানন্দা নদী, নদী রক্ষা বেড়ি বাঁধ, নদীপাড়ের বসতভিটা ও হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রবিউল ইসলাম টিপু নিজেই নদীর কিনার থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, “নদীর ওই জায়গাটি আমার বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি।” তাঁর এই বক্তব্য এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদীর ঘাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রের মাধ্যমে বালু-মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নদীর কিনার থেকে উত্তোলিত এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে সিরাজুলের বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার নতুন সড়ক নির্মাণে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাবিখা প্রকল্পে সড়কটির জন্য ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের ভরাটের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি কেনার পরিবর্তে নদীর কিনার থেকেই অবৈধভাবে বালু-মাটি তুলে এনে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক জানান, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাদের ভাষ্য, প্রতিবছরই চেয়ারম্যান নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে বালু-মাটি কাটেন। গত বছর নদীর উত্তর পাশে মাটি কাটা হলেও এবার নদী রক্ষা বেড়ি বাঁধসংলগ্ন দক্ষিণ অংশে উত্তোলন চলছে। ফলে নদীর তীরে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব গর্ত নদীভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সরকারি প্রকল্পে মাটি কেনার বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নদীর কিনার থেকে বালু-মাটি তুলে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে গোবরাতলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার রাস্তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় না করে নদীর মাটি কেটে এনে ভরাট দেওয়া হচ্ছে। এতে নদীর ক্ষতি হচ্ছে, আবার সরকারি অর্থও অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতার প্রভাবেই প্রকাশ্যে এসব হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, “সরকার নতুন রাস্তা নির্মাণ করছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সরকারি সম্পদ—নদী—ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্পে ভরাটের জন্য বরাদ্দ থাকলে নদী থেকে মাটি কাটার প্রয়োজন কী? প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।”

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গোবরাতলা ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সরকারি কাজেই এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেন নদী থেকে মাটি নেওয়া হলো এবং বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাব তিনি সাক্ষাতে কথা হবে বলে এড়িয়ে যান। এবং মোবাইল ফোন কেটে দেন।

গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদীর ঘাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রের মাধ্যমে বালু-মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মোঃ আলী হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,রবিউল ইসলাম টিপু চেয়ারম্যানের দাবি তাঁর দাদার সম্পত্তি থেকে মাটি তোলা হচ্ছে। কিন্ত তাদের ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি হলেও সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই আইন ভঙ্গ করে মাটি কাটছে। মাঠ জরিপের নকশা সংগ্রহ করে সরজমিন পরিদর্শণ করে আমার কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

 এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. শাহিনুর আলম বলেন, কাবিখা প্রকল্পের আওতায় রাস্তা নির্মাণের জন্য ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করেছি।  তবে রাস্তায় ভরাটের মাটি মহানন্দা নদীর কিনার থেকে  থেকে  আনা হয়েছে, তবে বিষয়টি একদিকে সাধারণ জনগণের ক্ষতি অন্যদিকে সরকারের প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রাম রক্ষা বেড়ি বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ছে। চেয়াম্যানের এমন কাজ  অবশ্যই আইনবহির্ভূত। ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নদী বা নদী রক্ষা বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাঁধ, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, “নদী থেকে বালু-মাটি কেটে সরকারি রাস্তার ভরাট দেওয়া হচ্ছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সরকারি কাজে সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরেও  গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ রবিউল ইসলাম টিপু  সরকারি জমি বা নদীর কিনার থেকে মাটি কেটে রাস্তায় বা বানিজ্যিক আকারে বিক্রি করে পারে কি না ?এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার শাখার উপ-পরিচালক উজ্জল কুমার ঘোষ জানান, সু-নিদৃষ্ঠ অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

“এটি নিছক দায় এড়ানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়; প্রশাসনের এমন গতানুগতিক ও দায়সারা বক্তব্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে যদি নদীর মাটি কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা হয় এবং প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে? অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো এলাকাবাসী।

উল্লেখ্য, এর আগেও গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবারই নামমাত্র তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাব ও শিথিলতার সুযোগে চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম টিপু একের পর এক সরকারি প্রকল্পের অর্থে অনিয়ম করে আসছেন।”

জনপ্রিয় সংবাদ

গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ সশস্ত্র আনসার মোতায়েন

সরকারি প্রকল্পের আড়ালে মহানন্দা ‘লুট’! টিপু চেয়ারম্যানের বালু-মাটি কাণ্ডে হুমকিতে বাঁধ-জনপদ

প্রকাশের সময়ঃ ১২:২৮:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

নিয়ম-নীতি ও পরিবেশ সুরক্ষা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর তলদেশ ও নদী রক্ষা বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রকাশ্যে বালু-মাটি কেটে সরকারি প্রকল্পে ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর খোদ সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, কাবিখা প্রকল্পের রাস্তার ভরাটের জন্য বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাইরে থেকে মাটি না কিনে নদীর কিনার থেকেই বালু-মাটি তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে মহানন্দা নদী, নদী রক্ষা বেড়ি বাঁধ, নদীপাড়ের বসতভিটা ও হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রবিউল ইসলাম টিপু নিজেই নদীর কিনার থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, “নদীর ওই জায়গাটি আমার বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি।” তাঁর এই বক্তব্য এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদীর ঘাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রের মাধ্যমে বালু-মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নদীর কিনার থেকে উত্তোলিত এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে সিরাজুলের বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার নতুন সড়ক নির্মাণে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাবিখা প্রকল্পে সড়কটির জন্য ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের ভরাটের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি কেনার পরিবর্তে নদীর কিনার থেকেই অবৈধভাবে বালু-মাটি তুলে এনে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক জানান, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাদের ভাষ্য, প্রতিবছরই চেয়ারম্যান নদীর বিভিন্ন অংশ থেকে বালু-মাটি কাটেন। গত বছর নদীর উত্তর পাশে মাটি কাটা হলেও এবার নদী রক্ষা বেড়ি বাঁধসংলগ্ন দক্ষিণ অংশে উত্তোলন চলছে। ফলে নদীর তীরে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব গর্ত নদীভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

সরকারি প্রকল্পে মাটি কেনার বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নদীর কিনার থেকে বালু-মাটি তুলে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে গোবরাতলা ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার রাস্তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সেই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় না করে নদীর মাটি কেটে এনে ভরাট দেওয়া হচ্ছে। এতে নদীর ক্ষতি হচ্ছে, আবার সরকারি অর্থও অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতার প্রভাবেই প্রকাশ্যে এসব হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।”

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, “সরকার নতুন রাস্তা নির্মাণ করছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সরকারি সম্পদ—নদী—ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্পে ভরাটের জন্য বরাদ্দ থাকলে নদী থেকে মাটি কাটার প্রয়োজন কী? প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।”

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গোবরাতলা ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সরকারি কাজেই এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কেন নদী থেকে মাটি নেওয়া হলো এবং বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাব তিনি সাক্ষাতে কথা হবে বলে এড়িয়ে যান। এবং মোবাইল ফোন কেটে দেন।

গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদীর ঘাট থেকে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রের মাধ্যমে বালু-মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মোঃ আলী হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,রবিউল ইসলাম টিপু চেয়ারম্যানের দাবি তাঁর দাদার সম্পত্তি থেকে মাটি তোলা হচ্ছে। কিন্ত তাদের ব্যক্তি মালিকানা সম্পত্তি হলেও সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই আইন ভঙ্গ করে মাটি কাটছে। মাঠ জরিপের নকশা সংগ্রহ করে সরজমিন পরিদর্শণ করে আমার কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

 এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. শাহিনুর আলম বলেন, কাবিখা প্রকল্পের আওতায় রাস্তা নির্মাণের জন্য ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করেছি।  তবে রাস্তায় ভরাটের মাটি মহানন্দা নদীর কিনার থেকে  থেকে  আনা হয়েছে, তবে বিষয়টি একদিকে সাধারণ জনগণের ক্ষতি অন্যদিকে সরকারের প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রাম রক্ষা বেড়ি বাঁধটি হুমকির মুখে পড়ছে। চেয়াম্যানের এমন কাজ  অবশ্যই আইনবহির্ভূত। ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নদী বা নদী রক্ষা বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাঁধ, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, “নদী থেকে বালু-মাটি কেটে সরকারি রাস্তার ভরাট দেওয়া হচ্ছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সরকারি কাজে সরকারি অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরেও  গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ রবিউল ইসলাম টিপু  সরকারি জমি বা নদীর কিনার থেকে মাটি কেটে রাস্তায় বা বানিজ্যিক আকারে বিক্রি করে পারে কি না ?এবিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার শাখার উপ-পরিচালক উজ্জল কুমার ঘোষ জানান, সু-নিদৃষ্ঠ অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

“এটি নিছক দায় এড়ানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়; প্রশাসনের এমন গতানুগতিক ও দায়সারা বক্তব্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে যদি নদীর মাটি কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা হয় এবং প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে? অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো এলাকাবাসী।

উল্লেখ্য, এর আগেও গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবারই নামমাত্র তদন্তের মাধ্যমে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাব ও শিথিলতার সুযোগে চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম টিপু একের পর এক সরকারি প্রকল্পের অর্থে অনিয়ম করে আসছেন।”