
জুমার আজানের সময় গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ তখন মসজিদমুখী। কেউ নামাজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, কেউবা ঘরের কাজে। ঠিক সেই সময় বাড়ির পাশে খেলতে থাকা পাঁচ কিশোরী পরিবারের সদস্যদের অগোচরে একসঙ্গে চলে যায় বন্যার পানিতে ভরা স্থানীয় ‘মরা নদী’র ধারে। একটু গোসল, একটু আনন্দ—কিন্তু কে জানত, সেই আনন্দের মুহূর্তই হয়ে উঠবে পাঁচটি পরিবারের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি!
একসঙ্গে পানিতে নেমেছিল পাঁচ কিশোরী। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবাই তলিয়ে যায় গভীর পানিতে। কারও সাঁতার জানা ছিল না। স্বজন ও স্থানীয়রা ছুটে এসে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি কাউকে। নদীর বুক থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় পাঁচটি ছোট্ট নিথর দেহ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা এলাকায় পদ্মা নদীর শাখা ‘মরা নদী’তে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে একই গ্রামের পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা।

একই সঙ্গে পাঁচ শিশুর এমন অকাল মৃত্যুতে পুরো চর চাকলা গ্রাম যেন মুহূর্তেই শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। যে গ্রামে কিছুক্ষণ আগেও শিশুদের হাসি-খেলার শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্নার আহাজারি। সন্তান হারানো মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস।
নিহতরা হলো—চর চাকলা গ্রামের মো. মাসুদের দুই মেয়ে মোসা. সুমাইয়া (১০) ও মোসা. আরিবা (৮), মো. নিজাম উদ্দিনের দুই মেয়ে মোসা. সুমাইয়া (১২) ও মোসা. সুরাইয়া (৯) এবং মো. শরিফুল ইসলামের মেয়ে মোসা. শরিফা (১১)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে বাড়ির পাশে পাঁচ কিশোরী একসঙ্গে খেলছিল। জুমার নামাজের সময় গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ মসজিদে অবস্থান করছিলেন এবং নারীরা নিজ নিজ ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের অগোচরে একপর্যায়ে পাঁচজন দলবেঁধে বাড়ির পাশের চর চাকলা মরা নদীর ধারে যায়।
সম্প্রতি বৃষ্টি ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে ‘মরা নদী’ নামে পরিচিত নদীটি পানিতে ভরে যায়। পদ্মা নদীর একটি শাখা হওয়ায় বর্ষা মৌসুম ও বন্যার সময়ে নদীটিতে পানি প্রবেশ করে এবং অনেক স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই পাঁচ কিশোরী বন্যার পানিতে গোসল করার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে নদীতে নামে। কিন্তু পানিতে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা তলিয়ে যেতে শুরু করে। কেউ সাঁতার না জানায় একে অপরকে বাঁচানোর চেষ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দুপুরের কিছু সময় পর শিশুদের না দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। জুমার নামাজ শেষে বিষয়টি জানাজানি হলে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং নদীতে নেমে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
প্রাণপণ চেষ্টার পর একে একে পাঁচ কিশোরীকেই পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরে দুপুর আনুমানিক ১টা ১৫ মিনিটের দিকে পাঁচজনকেই মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
একই গ্রামের তিন পরিবারের পাঁচ শিশুর নিথর দেহ একসঙ্গে উদ্ধারের দৃশ্য দেখে উপস্থিত মানুষজনও কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানদের লাশ দেখে স্বজনদের আহাজারিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুরা একসঙ্গে খেলছিল, তারা মুহূর্তের ব্যবধানে চিরতরে চলে গেছে না-ফেরার দেশে।
স্থানীয় এক ইউপি সদস্য ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, একই গ্রামের তিন পরিবারের পাঁচ শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় গভীর শোক নেমে এসেছে। গ্রামের প্রতিটি পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, চর চাকলা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটি স্থানীয়ভাবে ‘মরা নদী’ নামে পরিচিত। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা নদী। বর্ষা ও বৃষ্টির সময় পদ্মার পানি বেড়ে গেলে নদীটিও পানিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বৃষ্টি ও পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে নদীর বিভিন্ন স্থানে গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ পানির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বন্যার পানি, নদী ও খাল-বিল শিশু-কিশোরদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও অনেক সময় খেলতে খেলতে তারা অভিভাবকদের অগোচরে পানির কাছে চলে যায়। এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়াতে শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের আরও বেশি নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদী ও জলাশয় এলাকায় স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. একরামুল হোসাইন পিপিএম মরা নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
একটি দুপুর। পাঁচটি ছোট্ট প্রাণ। তিনটি পরিবারের স্বপ্ন। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু যেন থেমে গেল মরা নদীর পানিতে।
চর চাকলা গ্রামের আকাশে এখন আর শিশুদের হাসির শব্দ নেই। আছে শুধু স্বজনদের বুকফাটা কান্না, নিথর পাঁচ শিশুকে ঘিরে অসহনীয় শোক আর একটি প্রশ্ন—কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় কি সত্যিই এভাবে একসঙ্গে ঝরে যেতে পারে পাঁচটি তাজা প্রাণ?
একই গ্রামের পাঁচ কিশোরীর এমন করুণ মৃত্যুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 



















