ঢাকা ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
একসঙ্গে নিভল পাঁচ শিশুর প্রাণের প্রদীপ- পাশাপাশি কবরে শায়িত যাত্রাবাড়ী থানা থেকে পালানো নারী আসামি কেরানীগঞ্জে আটক রংপুরে ৪ খুন-গাফিলতির কোন সুযোগ নেই, আশ্বাস নতুন পুলিশ কমিশনারের নেপালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন- দেশে ফিরে অপু বিশ্বাস টঙ্গীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে আটক ৩ গাজীপুরে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে শ্বশুরকে কুপিয়ে হত্যা রূপগঞ্জে পরিত্যক্ত ভবন থেকে ৫ পাইপগান ও সাড়ে ৪ কেজি গাঁজা উদ্ধার দুর্গাপুরে চুরির অভিযোগে কিশোরকে গাছে বেঁধে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল কারওয়ান বাজারে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে অগ্নিকাণ্ড, স্থানীয়দের তৎপরতায় নিয়ন্ত্রণ গোপালগঞ্জে মাইক্রোবাস-মোটরসাইকেল-বাসের ত্রিমুখী সংঘর্ষে আহত ৪০

একসঙ্গে নিভল পাঁচ শিশুর প্রাণের প্রদীপ- পাশাপাশি কবরে শায়িত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চর চাকলা গোরস্থানে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর দাফন সম্পন্ন।

একসঙ্গে খেলাধুলা, একসঙ্গে নদীতে গোসল করতে যাওয়া—তারপর একে একে নিভে গেল পাঁচটি নিষ্পাপ প্রাণের প্রদীপ। শুক্রবার দুপুরেও যারা ছিল হাসি-খেলায় মেতে, সন্ধ্যা নামার আগেই তাদের নিথর দেহ ঠাঁই নিল মাটির গভীরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর চাকলা গ্রামে পদ্মার শাখা ‘মরা নদী’তে গোসল করতে নেমে ডুবে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর জানাজা শেষে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গোরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। একসঙ্গে পাঁচ শিশুর মরদেহ কবরে নামানোর হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসীর চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে চর চাকলা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীর শাখা ‘মরা নদী’তে গোসল করতে নামে পাঁচ শিশু। পানিতে নামার কিছুক্ষণ পরই তারা ডুবে যেতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুদের কেউ সাঁতার জানত না।

এ সময় স্থানীয় এক নারী শিশুদের পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন এবং আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। তার চিৎকার শুনে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। শুরু হয় প্রাণপণ উদ্ধার তৎপরতা।

একপর্যায়ে পানির নিচ থেকে একে একে পাঁচ শিশুকেই উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু শেষ। স্বজনদের বুকফাটা আহাজারির মধ্যেই নিশ্চিত হয়-নদীর জল কেড়ে নিয়েছে পাঁচটি পরিবারের পাঁচটি নিষ্পাপ সন্তানকে।

পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিহত শিশুদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয় বলে জানা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসেন জানান, ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ জানতে পারে পদ্মার শাখা মরা নদীতে পাঁচ শিশু ডুবে মারা গেছে। আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে তারা গোসল করতে নদীতে নামে। পরে একে একে পাঁচজন পানিতে ডুবে যায়।

তিনি আরও বলেন, ডুবে যাওয়ার সময় স্থানীয় এক নারী শিশুদের হাবুডুবু খেতে দেখে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন। নিহত শিশুদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ায় বসবাস করত এবং পরস্পরের আত্মীয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর জানাজা শেষে চর চাকলা গোরস্থানে তাদের পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জানাজার সময় শোকাহত মানুষের ঢল নামে। সন্তান হারানো পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। পাঁচটি ছোট্ট মরদেহ একে একে কবরে নামানোর সময় উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

জীবনে যেমন তারা একই পাড়ায় বেড়ে উঠেছে, একসঙ্গে খেলাধুলা করেছে এবং একই সঙ্গে নদীতে গিয়েছিল—মৃত্যুর পরও তাদের শেষ ঠিকানা হলো পাশাপাশি পাঁচটি কবর।

শুক্রবার সকালেও চর চাকলা গ্রামে শিশুদের হাসি-কোলাহলে মুখর ছিল পরিবেশ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই গ্রামেই নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। পাঁচটি পরিবারের বুক খালি করে চলে যায় পাঁচটি নিষ্পাপ প্রাণ।

এখন চর চাকলা গ্রামজুড়ে শুধু শোক আর কান্না। যে বাড়িগুলোতে কিছুক্ষণ আগেও শিশুদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। নদীর জলে একসঙ্গে ডুবে যাওয়া পাঁচটি শিশুর সঙ্গে যেন ডুবে গেছে পাঁচটি পরিবারের হাজারো স্বপ্নও।

একই দিনে, একই নদীতে, একই সঙ্গে শুরু হয়েছিল তাদের শেষ যাত্রা—আর সন্ধ্যায় পাশাপাশি পাঁচটি কবরে শেষ হলো তাদের পার্থিব পথচলা।

জনপ্রিয় সংবাদ

একসঙ্গে নিভল পাঁচ শিশুর প্রাণের প্রদীপ- পাশাপাশি কবরে শায়িত

একসঙ্গে নিভল পাঁচ শিশুর প্রাণের প্রদীপ- পাশাপাশি কবরে শায়িত

প্রকাশের সময়ঃ ০৩:১৭:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

একসঙ্গে খেলাধুলা, একসঙ্গে নদীতে গোসল করতে যাওয়া—তারপর একে একে নিভে গেল পাঁচটি নিষ্পাপ প্রাণের প্রদীপ। শুক্রবার দুপুরেও যারা ছিল হাসি-খেলায় মেতে, সন্ধ্যা নামার আগেই তাদের নিথর দেহ ঠাঁই নিল মাটির গভীরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর চাকলা গ্রামে পদ্মার শাখা ‘মরা নদী’তে গোসল করতে নেমে ডুবে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর জানাজা শেষে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গোরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। একসঙ্গে পাঁচ শিশুর মরদেহ কবরে নামানোর হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসীর চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে চর চাকলা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীর শাখা ‘মরা নদী’তে গোসল করতে নামে পাঁচ শিশু। পানিতে নামার কিছুক্ষণ পরই তারা ডুবে যেতে শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুদের কেউ সাঁতার জানত না।

এ সময় স্থানীয় এক নারী শিশুদের পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন এবং আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। তার চিৎকার শুনে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। শুরু হয় প্রাণপণ উদ্ধার তৎপরতা।

একপর্যায়ে পানির নিচ থেকে একে একে পাঁচ শিশুকেই উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু শেষ। স্বজনদের বুকফাটা আহাজারির মধ্যেই নিশ্চিত হয়-নদীর জল কেড়ে নিয়েছে পাঁচটি পরিবারের পাঁচটি নিষ্পাপ সন্তানকে।

পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিহত শিশুদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয় বলে জানা গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসেন জানান, ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ জানতে পারে পদ্মার শাখা মরা নদীতে পাঁচ শিশু ডুবে মারা গেছে। আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে তারা গোসল করতে নদীতে নামে। পরে একে একে পাঁচজন পানিতে ডুবে যায়।

তিনি আরও বলেন, ডুবে যাওয়ার সময় স্থানীয় এক নারী শিশুদের হাবুডুবু খেতে দেখে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন। নিহত শিশুদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ায় বসবাস করত এবং পরস্পরের আত্মীয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর জানাজা শেষে চর চাকলা গোরস্থানে তাদের পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জানাজার সময় শোকাহত মানুষের ঢল নামে। সন্তান হারানো পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। পাঁচটি ছোট্ট মরদেহ একে একে কবরে নামানোর সময় উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

জীবনে যেমন তারা একই পাড়ায় বেড়ে উঠেছে, একসঙ্গে খেলাধুলা করেছে এবং একই সঙ্গে নদীতে গিয়েছিল—মৃত্যুর পরও তাদের শেষ ঠিকানা হলো পাশাপাশি পাঁচটি কবর।

শুক্রবার সকালেও চর চাকলা গ্রামে শিশুদের হাসি-কোলাহলে মুখর ছিল পরিবেশ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই গ্রামেই নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। পাঁচটি পরিবারের বুক খালি করে চলে যায় পাঁচটি নিষ্পাপ প্রাণ।

এখন চর চাকলা গ্রামজুড়ে শুধু শোক আর কান্না। যে বাড়িগুলোতে কিছুক্ষণ আগেও শিশুদের কোলাহল ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। নদীর জলে একসঙ্গে ডুবে যাওয়া পাঁচটি শিশুর সঙ্গে যেন ডুবে গেছে পাঁচটি পরিবারের হাজারো স্বপ্নও।

একই দিনে, একই নদীতে, একই সঙ্গে শুরু হয়েছিল তাদের শেষ যাত্রা—আর সন্ধ্যায় পাশাপাশি পাঁচটি কবরে শেষ হলো তাদের পার্থিব পথচলা।