
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পার হলেও এখনো গড়ে ওঠেনি কার্যকর ও সমন্বিত সেন্ট্রাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আবাসিক হলের সামনের পথ, একাডেমিক ভবনের আশপাশ এবং খেলার মাঠে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কোথাও হাঁটুসমান না হলেও জমে থাকা পানি পেরিয়েই শিক্ষার্থীদের হল থেকে ক্লাসে যেতে হয়। অনেককে জুতা হাতে নিয়ে, আবার কাউকে ইট বা উঁচু স্থানে পা রেখে জলাবদ্ধ রাস্তা পার হতে দেখা যায়। বৃষ্টি থেমে গেলেও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ক্যাম্পাসে বসবাসকারী সবাইকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ ২১ বছরেও নোবিপ্রবিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সেন্ট্রাল ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা যেন ক্যাম্পাসবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে বিবি খাদিজা হল ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের সামনের সড়ক সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায়। একই চিত্র দেখা যায় কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনের সড়কসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চলাচল পথে। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় এসব সড়কে পানি জমে থাকে।

ফলে আবাসিক হল থেকে বের হয়ে ক্লাসে যাওয়া, লাইব্রেরি, প্রশাসনিক ভবন কিংবা অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় নারী শিক্ষার্থীসহ অনেকের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, সকালবেলা বৃষ্টির পর অনেক সময় ক্লাসে পৌঁছাতে জলাবদ্ধ রাস্তা পার হতে হয়। ফলে পোশাক ও জুতা ভিজে যাওয়ার পাশাপাশি পিছলে পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। কখনো কখনো জমে থাকা পানি এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে গিয়ে ক্লাসে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সুব্রত দে বলেন, “দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর সেন্ট্রাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যায়। বিশেষ করে হল থেকে বের হয়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় চরম সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় পানি মাড়িয়েই একাডেমিক ভবনের দিকে যেতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু চলাচলের সমস্যাই নয়, বর্ষা মৌসুমে সেন্ট্রাল ফিল্ড দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও শরীরচর্চার পরিবেশ ব্যাহত হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে থাকা সত্যিই হতাশাজনক।”
শুধু সড়ক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফিল্ডেও পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পর মাঠের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় দীর্ঘদিন খেলাধুলা করা সম্ভব হয় না। এতে নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিভিন্ন আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতা ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শরীরচর্চার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুফাচ্ছেল হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা শুধু চলাচলের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে না, এটি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সেখানে মশা ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অপরিচ্ছন্ন ও জমে থাকা পানি থেকে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
তিনি বলেন, “একটি আধুনিক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হক অমি বলেন, “শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের এই দুর্ভোগ যেন দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান চোখে পড়ছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাসরুম ও ভবনের সমষ্টি নয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল, খেলাধুলা এবং একটি স্বাস্থ্যকর ক্যাম্পাস পরিবেশ নিশ্চিত করাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
ক্যাম্পাসে সরেজমিনে দেখা যায়, বৃষ্টির পানি জমে থাকায় অনেক শিক্ষার্থী সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পার হচ্ছেন। কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি পার হতে ইট ফেলে অস্থায়ীভাবে চলাচলের পথ তৈরি করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ জুতা হাতে নিয়ে পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণাগার, লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে যাতায়াত ব্যাহত হলে সেটি সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের দাবি, শুধুমাত্র বর্ষাকালে অস্থায়ীভাবে পানি সরানোর উদ্যোগ না নিয়ে পুরো ক্যাম্পাসকে বিবেচনায় রেখে একটি আধুনিক ও টেকসই সেন্ট্রাল ড্রেনেজ মাস্টার সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। কোথায় পানি জমে, কোন পথে পানি নিষ্কাশন হবে এবং ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের অবকাঠামো সম্প্রসারণের সঙ্গে কীভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকাটা অবশ্যই দুঃখজনক।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে সামনে রেখে ৫০ বছর মেয়াদি একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। ওই মাস্টার প্ল্যানে একটি কার্যকর ও সমন্বিত সেন্ট্রাল ড্রেনেজ সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয় হলেও এর আগেই ক্যাম্পাসের যেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, সেসব স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলায় নোবিপ্রবি শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এগিয়ে গেলেও কার্যকর সেন্ট্রাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার সময় ক্যাম্পাসবাসীর ভোগান্তি এখনো কাটেনি। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনার কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সামান্য বৃষ্টির পর আর জল মাড়িয়ে হল থেকে ক্লাসে ছুটতে না হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক ও খেলার মাঠ ফিরে পায় স্বাভাবিক পরিবেশ।
নূসরাত জাহান, নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ 
























