
বৃহস্পতিবার বগুড়া সেনানিবাসে যোগদান করার কথা ছিল। এরপর শুক্রবার ছুটিতে প্রিয় বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই অপেক্ষার অবসান হলো একদিন আগেই। বাড়ি ফিরলেন সেনাসদস্য তাসনিম রিফাত—তবে জীবিত নয়, নিথর লাশ হয়ে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলনের সময় দুর্ঘটনায় নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য তাসনিম রিফাতের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাদ যোহর রাজশাহীর পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামে জানাজা শেষে সামরিক ও সামাজিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
নিয়তির আরও নির্মম এক অধ্যায় যেন অপেক্ষা করছিল রিফাতের জন্য। তিন বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা। সেই মায়ের পাশেই বৃহস্পতিবার চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন পরিবারের গর্ব, ২৮ বছর বয়সী সেনাসদস্য তাসনিম রিফাত।
হেলিকপ্টারে এলো সন্তানের মরদেহ, কান্নায় ভেঙে পড়ল গ্রাম
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে তাসনিম রিফাতের মরদেহ রাজশাহী সেনানিবাসে আনা হয়। পরে সেখান থেকে সড়কপথে তার গ্রামের বাড়ি পবা উপজেলার বিন্দারামপুর গ্রামে নেওয়া হয়।
যে বাড়ি থেকে একদিন দেশের সেবায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বেরিয়েছিলেন রিফাত, সেই বাড়িতেই ফিরলেন শেষবারের মতো—কফিনবন্দি হয়ে।
মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই চারদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া। শেষবারের মতো প্রিয় রিফাতকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। স্বজনদের বুকফাটা কান্না, আহাজারি আর শোকাহত মানুষের নীরবতায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রামের পরিবেশ।
বাবার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো এখনো বুঝে ওঠার বয়স হয়নি আড়াই বছরের ছোট্ট জুঁইয়ের—তার বাবা আর কোনো দিন তাকে কোলে তুলে নেবেন না, আদর করে ডাকবেন না, কিংবা ছুটিতে বাড়ি ফিরে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন না।

ফিরলেন একদিন আগেই—কিন্তু আর কোনো দিন ফিরে আসার জন্য নয়।
বুধবার ছিল অনুশীলনের শেষ দিন, শুক্রবার ছিল বাড়ি ফেরার কথা
নিহত তাসনিম রিফাতের বাবা আসাদুল ইসলাম ছেলের মৃত্যুর শোকে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কর্মক্ষম, দায়িত্বশীল ও পরিবারের গর্বের সন্তানকে হারিয়ে তার কণ্ঠে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর অসহায় আর্তনাদ।
তিনি বলেন,
“তাসনিম রিফাতের ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলনের শেষ দিন ছিল বুধবার। বৃহস্পতিবার বগুড়া সেনানিবাসে যোগদান করে শুক্রবার তার বাড়ি আসার কথা ছিল। সে একদিন আগেই বাড়ি আসল। কিন্তু লাশ হয়ে।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের সাগরে না ভাসায়, সে জন্য সবাইকে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন।
একটি পরিবারের অপেক্ষা ছিল শুক্রবারের। সন্তান বাড়ি ফিরবে, বাবার সঙ্গে কথা বলবে, ছোট্ট মেয়েকে কোলে নেবে, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাবে। কিন্তু সেই শুক্রবার আসার আগেই বৃহস্পতিবার বাড়িতে পৌঁছাল সেনাসদস্য রিফাতের নিথর মরদেহ।
ট্যাংকের ভেতরে গোলা বিস্ফোরণ, ঘটনাস্থলেই নিহত দুই সেনাসদস্য
এর আগে বুধবার দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিং অনুশীলনের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।
অনুশীলনের একপর্যায়ে ট্যাংকের ভেতরে একটি গোলা বিস্ফোরিত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মড কোরের ১৫ স্বতন্ত্র সাঁজোয়া স্কোয়াড্রনের সদস্য সৈনিক তাসনিম রিফাতসহ দুই সেনাসদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
দায়িত্ব পালন ও সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ফায়ারিং অনুশীলনে অংশ নিয়েছিলেন রিফাত। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
মাত্র ২৮ বছর বয়সে জীবন থেমে গেল এই সেনাসদস্যের। প্রায় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। দেশের জন্য দায়িত্ব পালনের স্বপ্ন নিয়ে কর্মজীবনের একটি বড় সময় পার করলেও শেষ পর্যন্ত আর ফেরা হলো না পরিবারের কাছে।
মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় দেশের এক সেনাসন্তান
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বাদ যোহর তাসনিম রিফাতের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে সামরিক মর্যাদা প্রদান করেন। এরপর সামাজিক মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
একজন সন্তানের মৃত্যুর পর বাবার বুক কতটা শূন্য হয়ে যায়, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তিন বছর আগে স্ত্রীকে হারানোর পর এবার হারালেন কর্মক্ষম সেনাসদস্য ছেলেকে। একের পর এক শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, চার ভাইবোনের মধ্যে তাসনিম রিফাত ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন পরিবারের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার অংশ। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পরিবারের কাছে হয়ে ওঠেন গর্বের মানুষ। স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি দায়িত্বশীল, শান্ত স্বভাবের এবং কর্মনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিল সবকিছু।
যে মানুষটি শুক্রবার বাড়ি ফিরে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা ছিল, সেই মানুষটিকেই বৃহস্পতিবার শেষবারের মতো দেখতে হলো পরিবারকে। যে বাবা ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তাকেই শেষ পর্যন্ত ছেলের কবরের পাশে দাঁড়াতে হলো। আর যে ছোট্ট শিশু বাবার ফেরার অপেক্ষা করার বয়সে পৌঁছানোর আগেই বাবাকে হারাল, তার জীবনে রয়ে গেল এক অপূরণীয় শূন্যতা।
শেষবারের মতো ফিরলেন রিফাত, কিন্তু আর কথা বললেন না
দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন তরুণ সেনাসদস্যের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত হয়েছে পুরো বিন্দারামপুর গ্রাম।
বৃহস্পতিবার গ্রামের মানুষের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল প্রার্থনা আর হৃদয়ে ছিল একটাই প্রশ্ন—যে ছেলেটি শুক্রবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সে কেন একদিন আগেই ফিরল, তবে লাশ হয়ে?
শেষ পর্যন্ত মায়ের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সৈনিক তাসনিম রিফাত।
শুক্রবার যে বাড়িতে হাসিমুখে ফেরার কথা ছিল, বৃহস্পতিবার সেই বাড়িতেই ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে।
ফিরলেন একদিন আগেই—কিন্তু আর কোনো দিন ফিরে আসার জন্য নয়।
অধিকার ডেস্কঃ 






















