
মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুষের অভিযোগ, নিজের পাসপোর্ট করতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা। পরিবারের এমন ভোগান্তি ও ক্ষোভকে প্রতিবাদের শক্তিতে রূপ দিল ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ। তৈরি করল ব্যতিক্রমী একটি ওয়েবসাইট—‘ঘুষ ডট সাইট’।
এক কিশোরের এই ডিজিটাল প্রতিবাদ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়াত শিক্ষিকা আমিনা খাতুনের পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রভিডেন্ট ফান্ড-সংক্রান্ত নথি নতুন করে প্রস্তুতের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার স্বামী শরীফুল ইসলাম শামীম।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন দুই কর্মীকে শোকজ নোটিশ দেন। তারা হলেন কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমান।
নোটিশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘ঘুষ ডট সাইট’ নিয়ে আলোচনার ঝড়
এর আগে রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুষ, ছেলে তৈরি করল ঘুষ ডট সাইট’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদে সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এবং কিশোর শাহেদের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
সংবাদ প্রকাশের পরই প্রয়াত শিক্ষিকার স্বামী এবং শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীমকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে ডাকা হয়

সোমবার বেলা ১১টার দিকে তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে যান। দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থানের পর তিনি জানান, সংবাদ প্রকাশের পর দ্রুতগতিতে তাদের ফাইলের কাজ শুরু হয়েছে।
শরীফুল ইসলাম বলেন, আগের তৈরি করা নথিপত্র পরিবর্তন করে নতুন করে নথি প্রস্তুতের কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগলেও দ্রুত পরিবারের পাওনা অর্থ পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
মায়ের মৃত্যুর পর শুরু দীর্ঘ ভোগান্তি
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের দাবি, চাকরির মাত্র ১৩ বছরের মাথায় আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তার সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ দিতে হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা—সব মিলিয়ে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও ১০ লাখ টাকার বেশি পাওনা, ঘুষ দাবির অভিযোগ
পরিবারের দাবি, শুধু প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা নয়, প্রয়াত শিক্ষিকার কল্যাণ তহবিলের প্রায় ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য প্রায় ৮ লাখ টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন করে জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে।
এই অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় শিক্ষা কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন বলেও অভিযোগ পরিবারের।
অর্থাৎ, একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে নিজের প্রাপ্য অর্থ পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা ও ঘুষের অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিবারটির জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে চরম দুর্ভোগের।
‘ঘুষ নেবেন? এবার অনলাইনে উঠবে অভিযোগ’
পরিবারের এমন অভিজ্ঞতার পর চুপ করে বসে থাকেনি শাহেদ। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই প্রযুক্তিকে বেছে নেয় প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে।
ঘুষের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে মানুষের ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সে তৈরি করেছে ‘ঘুষ ডট সাইট’ নামে ওয়েবসাইট।
একজন কিশোরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোগ এখন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবাদের আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
কে এই শাহেদ?
১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ বর্তমানে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাবার সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছেন।
তার বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়।
একজন শিক্ষার্থীর বয়সে দাঁড়িয়ে শাহেদের এমন উদ্যোগ এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সরকারি সেবা পেতে কেন নাগরিককে ঘুষের অভিযোগ নিয়ে পথে নামতে হবে? কেন একজন কিশোরকে মায়ের প্রাপ্য অর্থের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে প্রতিবাদ করতে হবে?
গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর দুই কর্মীকে শোকজ এবং আটকে থাকা নথির কাজ শুরু হওয়ায় বিষয়টি এখন প্রশাসনিক সেবায় জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মায়ের পাওনা টাকা আদায়ের লড়াই থেকে শুরু হওয়া শাহেদের প্রতিবাদ এখন শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়—এটি ঘুষের বিরুদ্ধে এক কিশোরের প্রশ্ন, আর প্রশাসনের জবাবদিহির এক কঠিন পরীক্ষা।
শফিয়েল আলম সুমন,ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 



















