
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম সন্দেহে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমে এলেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। গত আগস্ট মাসের প্রথম দুই সপ্তাহের তুলনায় শেষ সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, আর চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট পাঁচজনের প্রাণহানি ঘটেছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হওয়ায় বারান্দা, মেঝে এমনকি দুই বেডের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাতেও মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে।
হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট মাসে মোট ২৩৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম ১৫ দিনে ভর্তি হয়েছিলেন ৮৫ জন, আর পরের ১৫ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ১৫১ জন। গত ১০ ও ৩১ আগস্ট দুজন রোগী ডেঙ্গুতে মারা যান। গত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৯৩ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং বর্তমানে ৪৭ জন ডেঙ্গু আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথকভাবে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে গড়ে তোলা আইসোলেশন ইউনিটে বেড সংখ্যা মাত্র ১৬টি, অথচ রোগীর সংখ্যা তার প্রায় তিনগুণ। ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে ৩০ (এ) নম্বর ওয়ার্ডকেও ডেঙ্গু আইসোলেশনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, যা চালু হলে মোট শয্যা সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৬টিতে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের আইসোলেশনে দেখা যায়, নির্ধারিত বেডের বাইরেও বারান্দা ও শয্যার মাঝের ফাঁকা জায়গায় মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। গাদাগাদি পরিবেশে মানবেতর সময় পার করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
চিকিৎসাধীন এক রোগী অভিযোগ করেন, এই ওয়ার্ডে নার্স-চিকিৎসকদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম, সম্ভবত সংক্রমণের ভয়েই তারা কম আসেন। সাধারণ কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া গেলেও বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আলমগীর হোসেন নামে আরেক রোগী বলেন, গাদাগাদি পরিবেশের কারণে তারা আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং চিকিৎসার মান নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। ডেঙ্গু প্রকোপ বৃদ্ধির এই সময়ে আক্রান্তদের প্রতি বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। সিট না পেয়ে মেঝেতে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নেওয়া আরেকজন রোগী জানান, দুদিন আগে ভর্তি হলেও পর্যাপ্ত সিট না থাকায় এবং চিকিৎসার মান নিয়ে তিনিও সন্তুষ্ট নন।
চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী ইউসুফ আলী গত সপ্তাহে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর গত সোমবার তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পর তিনি রাজশাহীতে এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন এবং গতকাল মঙ্গলবার সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম মাহমুদ জানান, সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। ডেঙ্গু সন্দেহভাজন রোগীদের প্রাথমিকভাবে মেডিসিন ইউনিটে ভর্তি করা হয়, পরে পরীক্ষার ফল অনুযায়ী তাদের আইসোলেশনে স্থানান্তর করা হয়। বাড়তি চাপ সামলাতে নতুন ওয়ার্ডে আইসোলেশন চালুর মাধ্যমে শয্যা সংকট দ্রুত কাটবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি এবং আক্রান্তদের যথাসাধ্য সেবা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার কথা জানান।
অন্যদিকে হামের পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতালের তথ্যমতে, গত আগস্টে হাম সন্দেহে ৮৯ জন ভর্তি হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৭৯ জন ইতিমধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে ২৮ জন হাম সন্দেহে চিকিৎসাধীন আছেন এবং গত ১১ আগস্ট একজনের মৃত্যু হয়েছিল।
সরেজমিন হাম ইউনিট পরিদর্শনে দেখা যায়, নির্ধারিত বেডের অধিকাংশই এখন ফাঁকা। আক্রান্ত শিশুদের কেউ কষ্ট পাচ্ছে, কেউ হাতে ক্যানোলা নিয়ে ঘুমাচ্ছে, আবার সুস্থতার পথে থাকা কিছু শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কাটাচ্ছে।
কুষ্টিয়া থেকে চিকিৎসার জন্য আসা ৮ মাস বয়সী শিশু মোস্তাকিম বিল্লাহর দাদা মোহাম্মদ কলিম উদ্দীন জানান, কুষ্টিয়ায় পাঁচদিন চিকিৎসার পরও উন্নতি না হওয়ায় গত শনিবার রাজশাহীতে নিয়ে আসেন তারা এবং এখানে চিকিৎসাসেবা ভালো পাচ্ছেন বলে জানান, যদিও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। তবে শিশুদের চিকিৎসায় নার্সদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি, জানান শিশুটিকে ক্যানোলা পরাতে একাধিকবার সুচ ফোটাতে হয়েছিল, যাতে সে ভীষণ কষ্ট পায়।
অধিকার ডেস্কঃ 





















