ঢাকা ০৫:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ময়মনসিংহে মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে চাকু দিয়ে কুপিয়ে তরুণকে হত্যা চাকসুর মেয়াদ শেষের ১৭ দিন আগে শপথ নিলেন আকাশ দাশ চরপাথালিয়া বাজারে ভয়াবহ আগুন, ৬ দোকান পুড়ে কোটি টাকার ক্ষতির দাবি দুর্গাপূজায় রাজধানীর প্রতিটি মণ্ডপে কঠোর নিরাপত্তা, প্রস্তুত ডিএমপির বিশেষ ইউনিট ঢাকার বার্তা নিয়ে দিল্লিতে ভারতীয় হাইকমিশনার, মোদির সঙ্গে বৈঠক অর্থনীতি চাঙা, তবুও ভারতের শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে যে ৫ কারণ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিএমপির ২৫৮৩ মামলা, ডাম্পিং ৪৭৬ গাড়ি শূন্য থেকে বিশ্বসেরা, মেসির ফুটবলযাত্রা যেন রূপকথার গল্প নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরলেন উপাচার্য ২২ জেলায় গড়ে উঠছে ‘শিশু স্বর্গ’, জানালেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

অর্থনীতি চাঙা, তবুও ভারতের শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে যে ৫ কারণ

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৫:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২৩৩ Time View

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বিভিন্ন কারণে চাপের মুখে পড়েছে ভারতের শেয়ারবাজার।

ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও দেশটির শেয়ারবাজারে চলছে বড় ধরনের চাপ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, সুদের হার, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা, রুপির দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে থাকার মতো কয়েকটি কারণে ভারতীয় শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চলতি বছর বিশ্বের বড় শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে ভারতের বাজার অন্যতম দুর্বল পারফরমার। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দরপতন আরও তীব্র হয়েছে। সেনসেক্স ও নিফটি সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও এর আগে টানা আট সপ্তাহ পতনের মধ্যে ছিল। রয়টার্সের হিসাবে, প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে এটি ভারতের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাপ্তাহিক দরপতনের ধারা।

এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপরও। চলতি বছরে নিফটিতে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকে বিনিয়োগ করলে প্রায় ৬২ শতাংশ এবং গত দুই বছরে প্রায় ১৭০ শতাংশ পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া যেত।

ভারতীয় বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বার্নস্টেইন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। তবে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাজারকে আরও বড় পতন থেকে কিছুটা সামলে রেখেছে।

বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ডে ভারতীয়দের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশটির মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছর তা প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোতে চাপ থাকায় শেয়ারবাজারে সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাওয়া ভারতীয় পরিবারগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের শেয়ারবাজার দুর্বল হওয়ার পেছনে প্রধান পাঁচটি কারণ রয়েছে।

১. মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জ্বালানি সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা ভারতের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।

ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইন্ডিয়ার ফান্ড ম্যানেজার হরি শ্যামসুন্দর বিবিসিকে বলেন, তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকলে ভারতীয় অর্থনীতি তা সামাল দিতে পারে। তবে দাম ১০০ ডলারের ওপরে গেলে মূল্যস্ফীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং কোম্পানির আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ে।

ভারতের জ্বালানি চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। দেশটির অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশের পাশাপাশি এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ভারতের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

রাশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

২. বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের কার্যকর সুদ ৫ শতাংশের ওপরে থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের আকর্ষণ বেড়েছে। সুদের হার বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান বাজারের সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে মার্কিন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা তৈরি হয়।

ফলে ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ কমে গিয়ে শেয়ারবাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

৩. দুর্বল হচ্ছে ভারতীয় রুপি

ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো রুপির দরপতন। স্থানীয় মুদ্রায় কোনও বিনিয়োগে লাভ হলেও রুপির মূল্য ডলারের বিপরীতে কমে গেলে সেই লাভের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব করার সময় কমে যায়।

গত এক দশকে ডলারের হিসাবে নিফটির বার্ষিক গড় রিটার্ন প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের তুলনায় এই রিটার্ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ শেয়ারবাজারের দুর্বল পারফরম্যান্সের সঙ্গে রুপির অবমূল্যায়ন যুক্ত হওয়ায় ভারতের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণ আরও কমছে।

৪. দরপতনের পরও অনেক শেয়ার তুলনামূলক ব্যয়বহুল

গত দুই বছরে ভারতের শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য সংশোধন হয়েছে। এর ফলে শেয়ারের মূল্যায়ন আগের তুলনায় কমেছে এবং অন্যান্য উদীয়মান বাজারের তুলনায় ভারতের যে বড় প্রিমিয়াম ছিল, সেটিও সংকুচিত হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, আয়ের তুলনায় ভারতের অনেক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য এখনও তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশের কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে। এআই-সম্পর্কিত ব্যবসা তাদের আয় ও মুনাফা বাড়িয়েছে, ফলে তুলনামূলক বেশি মূল্যায়নের পেছনে বাস্তব আয়ের প্রবৃদ্ধিও রয়েছে।

৫. এআই বিপ্লবে পিছিয়ে ভারত

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে দেশটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বার্নস্টেইন রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অনেক বড় কোম্পানি এখনও পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ শিল্পে বড় বিনিয়োগের বদলে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা পেতে সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করছে।

দেশটির ছোট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, যাতে বড় বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হয়।

ভারত ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালেও ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক বা চীনের ডিপসিকের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখনও তৈরি করতে পারেনি। অথচ এআইভিত্তিক অর্থনীতির বড় অংশের মূল্য সংযোজন এই খাতেই তৈরি হচ্ছে।

তবে এআই, মহাকাশ, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিপ-টেকের মতো খাতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর অগ্রগতি শুরু হয়েছে। এসব খাত ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বিনিয়োগে বড় ভূমিকা রাখতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সামনে কী?

ভারতের শেয়ারবাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দাম, শেয়ারের মূল্যায়ন এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলের ওপর।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কেয়ারএজের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে এবং ভারতীয় শেয়ারের মূল্যায়ন আরও আকর্ষণীয় পর্যায়ে এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ আবার বাজারে ফিরতে পারে। তবে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক ফল প্রকাশ শুরু হলে জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদার প্রভাব তাদের মুনাফায় কতটা পড়েছে, তার আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের বিপরীতে ভারতীয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখনও মিউচুয়াল ফান্ডে নিয়মিত অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এই দেশীয় বিনিয়োগই আপাতত বাজারকে বড় ধরনের পতন থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে।

তবে বাজারে আরও বড় সংশোধন হলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক বিনিয়োগ কতটা বজায় থাকে, সেটিই ভারতের শেয়ারবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ময়মনসিংহে মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে চাকু দিয়ে কুপিয়ে তরুণকে হত্যা

অর্থনীতি চাঙা, তবুও ভারতের শেয়ারবাজারে ধসের পেছনে যে ৫ কারণ

প্রকাশের সময়ঃ ০৫:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও দেশটির শেয়ারবাজারে চলছে বড় ধরনের চাপ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, সুদের হার, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা, রুপির দুর্বলতা এবং প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে থাকার মতো কয়েকটি কারণে ভারতীয় শেয়ারবাজারের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

চলতি বছর বিশ্বের বড় শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে ভারতের বাজার অন্যতম দুর্বল পারফরমার। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দরপতন আরও তীব্র হয়েছে। সেনসেক্স ও নিফটি সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও এর আগে টানা আট সপ্তাহ পতনের মধ্যে ছিল। রয়টার্সের হিসাবে, প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে এটি ভারতের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাপ্তাহিক দরপতনের ধারা।

এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপরও। চলতি বছরে নিফটিতে বিনিয়োগকারীদের সম্পদের মূল্য প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচকে বিনিয়োগ করলে প্রায় ৬২ শতাংশ এবং গত দুই বছরে প্রায় ১৭০ শতাংশ পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া যেত।

ভারতীয় বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বার্নস্টেইন রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছেন। তবে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাজারকে আরও বড় পতন থেকে কিছুটা সামলে রেখেছে।

বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ডে ভারতীয়দের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশটির মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিমাণ ছিল প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছর তা প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোতে চাপ থাকায় শেয়ারবাজারে সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাওয়া ভারতীয় পরিবারগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের শেয়ারবাজার দুর্বল হওয়ার পেছনে প্রধান পাঁচটি কারণ রয়েছে।

১. মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জ্বালানি সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা ভারতের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে রয়েছে।

ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইন্ডিয়ার ফান্ড ম্যানেজার হরি শ্যামসুন্দর বিবিসিকে বলেন, তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকলে ভারতীয় অর্থনীতি তা সামাল দিতে পারে। তবে দাম ১০০ ডলারের ওপরে গেলে মূল্যস্ফীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং কোম্পানির আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ে।

ভারতের জ্বালানি চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। দেশটির অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশের পাশাপাশি এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ভারতের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

রাশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করলেও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্কের হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

২. বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের কার্যকর সুদ ৫ শতাংশের ওপরে থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের আকর্ষণ বেড়েছে। সুদের হার বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ উদীয়মান বাজারের সম্পদ থেকে অর্থ সরিয়ে মার্কিন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা তৈরি হয়।

ফলে ভারতের মতো উদীয়মান বাজারে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ কমে গিয়ে শেয়ারবাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

৩. দুর্বল হচ্ছে ভারতীয় রুপি

ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো রুপির দরপতন। স্থানীয় মুদ্রায় কোনও বিনিয়োগে লাভ হলেও রুপির মূল্য ডলারের বিপরীতে কমে গেলে সেই লাভের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব করার সময় কমে যায়।

গত এক দশকে ডলারের হিসাবে নিফটির বার্ষিক গড় রিটার্ন প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের তুলনায় এই রিটার্ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ শেয়ারবাজারের দুর্বল পারফরম্যান্সের সঙ্গে রুপির অবমূল্যায়ন যুক্ত হওয়ায় ভারতের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগের আকর্ষণ আরও কমছে।

৪. দরপতনের পরও অনেক শেয়ার তুলনামূলক ব্যয়বহুল

গত দুই বছরে ভারতের শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য সংশোধন হয়েছে। এর ফলে শেয়ারের মূল্যায়ন আগের তুলনায় কমেছে এবং অন্যান্য উদীয়মান বাজারের তুলনায় ভারতের যে বড় প্রিমিয়াম ছিল, সেটিও সংকুচিত হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, আয়ের তুলনায় ভারতের অনেক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য এখনও তুলনামূলক বেশি।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশের কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে। এআই-সম্পর্কিত ব্যবসা তাদের আয় ও মুনাফা বাড়িয়েছে, ফলে তুলনামূলক বেশি মূল্যায়নের পেছনে বাস্তব আয়ের প্রবৃদ্ধিও রয়েছে।

৫. এআই বিপ্লবে পিছিয়ে ভারত

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে দেশটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বার্নস্টেইন রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অনেক বড় কোম্পানি এখনও পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ শিল্পে বড় বিনিয়োগের বদলে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা পেতে সরকারি নীতির ওপর নির্ভর করছে।

দেশটির ছোট প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, যাতে বড় বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হয়।

ভারত ডেটা সেন্টার ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালেও ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক বা চীনের ডিপসিকের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখনও তৈরি করতে পারেনি। অথচ এআইভিত্তিক অর্থনীতির বড় অংশের মূল্য সংযোজন এই খাতেই তৈরি হচ্ছে।

তবে এআই, মহাকাশ, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিপ-টেকের মতো খাতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর অগ্রগতি শুরু হয়েছে। এসব খাত ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বিনিয়োগে বড় ভূমিকা রাখতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সামনে কী?

ভারতের শেয়ারবাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি তেলের দাম, শেয়ারের মূল্যায়ন এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলের ওপর।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান কেয়ারএজের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে এবং ভারতীয় শেয়ারের মূল্যায়ন আরও আকর্ষণীয় পর্যায়ে এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ আবার বাজারে ফিরতে পারে। তবে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ত্রৈমাসিক আর্থিক ফল প্রকাশ শুরু হলে জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদার প্রভাব তাদের মুনাফায় কতটা পড়েছে, তার আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের বিপরীতে ভারতীয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখনও মিউচুয়াল ফান্ডে নিয়মিত অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এই দেশীয় বিনিয়োগই আপাতত বাজারকে বড় ধরনের পতন থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে।

তবে বাজারে আরও বড় সংশোধন হলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক বিনিয়োগ কতটা বজায় থাকে, সেটিই ভারতের শেয়ারবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।