
‘আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা’—স্বজন হারানোর শোকে কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান মো. জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা। কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের একমাত্র ছেলে নাফিস তেহামী (২৬), মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) ও পাঁচ বছর বয়সী নাতি ফাইজান আহম্মেদ নূর মারা গেছেন।
জিয়াদুল কবির বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
মুঠোফোনে জিয়াদুল কবির বলেন, ‘আমার এখন বেঁচে থেকে লাভ কী? কী নিয়ে বাঁচব? সব তো আমার শেষ হয়ে গেছে।’ তাঁর স্ত্রী কাজল রেখাও সন্তান ও নাতিকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছেলে, মেয়ে, নাতি—সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা আর দুনিয়ায় বেঁচে থেকে কী করব?’
ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলমও স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হারিয়ে শোকাহত। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তাঁদের সঙ্গে নিজেরও মৃত্যু হলে হয়তো এই কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো না।
পূজার ছুটিতে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁরা
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন নূর আলম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ফারিহা কবির, ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাফিস তেহামী এবং দুই ভায়রার পরিবারের আরও ছয়জন। সব মিলিয়ে তাঁদের দলে ছিলেন ১০ জন।
নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি স্নাতকোত্তরে অধ্যয়ন করছিলেন। বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান তিনি।
পরদিন শুক্রবার সকালে জরুরি কাজে নূর আলম চুয়াডাঙ্গায় ফিরে যান। স্ত্রী, ছেলে ও শ্যালকসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা রিসোর্টেই ছিলেন। শনিবার সকালে সেখানে আগুন লাগার ঘটনায় নাফিস, ফারিহা ও ফাইজানের মৃত্যু হয়।
একই পরিবারের আরও তিন তরুণীর মৃত্যু
অগ্নিকাণ্ডে জিয়াদুল কবিরের দুই ভায়রার পরিবারের আরও তিন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭)।
স্বজনদের মৃত্যুর খবর পেয়ে জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
মালিহা ও নাবিলার মা রোকসানা আক্তার রীনাও সন্তানদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি তাঁদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান।
ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত করার কথা প্রশাসনের
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। তিনি বলেন, নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
স্বজনদের একসঙ্গে হারিয়ে পরিবারগুলো এখন গভীর শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আনন্দের ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি তাঁদের জীবনে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।
অধিকার ডেস্কঃ 
























