
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। গত বছরের তুলনায় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। এমন ফলাফলের কারণ অনুসন্ধান করে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শোকজ, পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিল ও এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন।
একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন শূন্য পাস করা ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাড়ছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪২টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫টিতে। ২০২৫ সালে এক লাফে এ সংখ্যা হয় ২০২টি।
সর্বশেষ ২০২৬ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৮১টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ৫৫টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সব মিলিয়ে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৩টিতে।
বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ১০২ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। দিনাজপুর বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ৪৯টি এবং রাজশাহী বোর্ডে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে।
এদিকে, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ
শূন্য পাসের কারণ অনুসন্ধান ও দায় নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের শিক্ষা বোর্ডে ডেকে ফলাফলের কারণ জানতে চাওয়া হবে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলবেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
এ সময় গত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থী সংখ্যা, পাসের হার, শিক্ষকসংখ্যা ও শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হবে। এসব তথ্য যাচাই করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানান, গত পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে একবার শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করলে শোকজ করা হবে। একই সময়ে দুবার এমন ফল হলে পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর তিনবার এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের সুপারিশ করা হবে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের এমপিও বন্ধ না করে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলির সুপারিশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বোর্ডের ২৫ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ
জাতীয় পর্যায়ের এই পরিস্থিতির পাশাপাশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২৫টি প্রতিষ্ঠানও এবার শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ১০২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও একজনও পাস করতে পারেনি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী, ২৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকার তিনটি, ফরিদপুরের চারটি, গাজীপুরের একটি, গোপালগঞ্জের একটি, কিশোরগঞ্জের দুটি, মানিকগঞ্জের দুটি, মুন্সীগঞ্জের তিনটি, নারায়ণগঞ্জের দুটি, রাজবাড়ীর দুটি, শরীয়তপুরের একটি এবং টাঙ্গাইলের চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ঢাকার তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো ই. হক কলেজ, সিটি মডেল কলেজ ও এশিয়ান আইডিয়াল কলেজ। ফরিদপুরের কবি জসীম উদ্দীন উচ্চবিদ্যালয়, মেঘচামী আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাজী সিরাজুল ইসলাম গার্লস হাই স্কুল এবং সাঈদা সাজেদা চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে কেউ পাস করেনি।
গাজীপুরের জালাল উদ্দিন মাস্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং গোপালগঞ্জের দুর্বাসুর মডেল হাই স্কুলও রয়েছে এই তালিকায়।
কিশোরগঞ্জের কিশোরগঞ্জ সিটি কলেজ ও আবুল কাশেম কলেজ এবং মানিকগঞ্জের ড. আবদুর রহিম খান মহিলা কলেজ ও গোলাম মনির হোসেন মহিলা কলেজে শূন্য পাসের ফল এসেছে।
মুন্সীগঞ্জের মদিনীমণ্ডল গার্লস কলেজ, রাইদা অভয় পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও হাসাড়াখালি কিশোর উচ্চবিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জের নবীগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকেও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
এ ছাড়া রাজবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আবদুল জব্বার কলেজ ও কাচারী পাড়া হাই স্কুল, শরীয়তপুরের নগর পাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং টাঙ্গাইলের আলোয়া হাই স্কুল, খন্দকার আসাদুজ্জামান একাডেমি, শিমলা পাবলিক হাই স্কুল ও সুরা তরুণ শিক্ষাঙ্গণ রয়েছে শূন্য পাসের তালিকায়।
কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। সেই হিসাবে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
অধিকার ডেস্কঃ 





















