
দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি আর সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে ফাঁস হয়েছে ডিজেল পাচারের এক চাঞ্চল্যকর গোপন কারবার। গভীর রাতে ইটভাটার আড়ালে ট্যাঙ্কলরি থেকে ড্রামে ড্রামে ডিজেল নামিয়ে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ আলামতসহ একটি ট্যাঙ্কলরি জব্দ করেছে পুলিশ। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং উঠেছে জ্বালানি সিন্ডিকেটের ছায়া।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে উপজেলার মেসার্স হিরো ব্রিকস ইটভাটার সামনে অভিযান চালিয়ে ডিজেলভর্তি ট্যাঙ্কলরি (চট্র-মেট্রো ঢ-৪১০৮৩০) জব্দ করে ভোলাহাট থানা পুলিশ। একই সঙ্গে পাচার কাজে ব্যবহৃত একটি নসিমন, চারটি ট্রলি, দুটি চার্জারভ্যান, অর্ধশতাধিক ড্রাম ও জার উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ট্যাঙ্কলরিটিতে আনুমানিক ৭ থেকে ৯ হাজার লিটার ডিজেল ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, গভীর রাতে যেভাবে গোপনে ড্রামে তেল ভরা হচ্ছিল, তা ছিল সুসংগঠিত পাচার চক্রের কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত।

পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, গোপন খবরে পুলিশ জানতে পারে ইটভাটার সামনে ট্যাঙ্কলরি থেকে তেল খালাস হচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ হানা দিলে সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে যায়। জব্দ লরিটি কোন ডিপোর, কার মালিকানাধীন এবং কীভাবে নির্ধারিত গন্তব্যের বাইরে এলো- তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। “প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ পরিবহন নয়, বরং সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের কর্মকাণ্ড বলেই মনে করছেন অনেকে।
এ ঘটনায় সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন-যখন কৃষি, পরিবহন ও সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির চাপ ও অস্থিরতা রয়েছে, তখন কি একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফার খেলায় নেমেছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা পর্যায়ে ডিজেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে রাতের আঁধারে ড্রামে ড্রামে তেল সরানো ছিল “কালোবাজারি ও মজুদ বাণিজ্যের” অংশ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সানাউল মোরশেদ বলেন,“নথিপত্র অনুযায়ী মঙ্গলবার স্থানীয় পাম্পে এই তেল পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু গভীর রাতে কেন ভিন্ন স্থানে খালাস হচ্ছিল— সেটি অত্যন্ত সন্দেহজনক। তদন্তে সত্যতা মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলার একমাত্র জ্বালানি তেল বিক্রয় কেন্দ্র মেসার্স ভোলাহাট ফিলিং স্টেশন-এর মালিক আব্দুল লতিফ দাবি করেছেন, জব্দ লরিটি তার নয়। তবে ঘটনাস্থল ঘিরে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
জব্দ একটি ভ্যান ছাড়াতে আসা খুচরা তেল ব্যবসায়ী খতিজা বেগম জানান, আগের রাতেই তিনি পাম্প মালিককে ২১ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন তেল নেওয়ার জন্য।অন্যদিকে একটি ট্রলির চালক বলেন,“পাম্পের লোকজন ফোন দিয়ে তেল নিতে ডেকেছিল। তাই এসেছিলাম।”এদিকে পাম্পের মালিক ও কর্মচারীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের পলাতক থাকাও সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।
ঘটনার স্থান ইটভাটা হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- ইটভাটা কি শুধুই লোকেশন, নাকি পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট?যদিও ইটভাটার মালিক হাবিল উদ্দিন দোয়েল দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দোষারোপও।ভোলাহাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইয়াজদানী জর্জ বলেন,“সরকারকে বিব্রত করতে একটি কুচক্রী মহল এই অপকর্মে জড়িত।”
অন্যদিকে ভোলাহাট উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহনাজ খাতুন অভিযোগ করে বলেন,“ফিলিং স্টেশন ও ইটভাটার মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে এই ঘটনা।”স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু ট্যাঙ্কলরি জব্দে দায় শেষ নয়— এর পেছনে জড়িত জ্বালানি সিন্ডিকেট, মজুদদার ও কালোবাজারি নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে হবে।
কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গোপন পাচার শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট নয়; কৃষি উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরেও এর প্রভাব পড়ে।
ভোলাহাট থানার সাব-ইন্সেপেক্টর মোঃ শাহিন জানান,সোমবার (২৭ এপ্রিল) দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে উপজেলার মেসার্স হিরো ব্রিকস ইটভাটার সামনে অভিযান চালিয়ে ডিজেলভর্তি ট্যাঙ্কলরি (চট্র-মেট্রো ঢ-৪১০৮৩০) জব্দ করে ভোলাহাট থানা পুলিশ। একই সঙ্গে পাচার কাজে ব্যবহৃত একটি নসিমন, চারটি ট্রলি, দুটি চার্জারভ্যান, অর্ধশতাধিক ড্রাম ও জার উদ্ধার করা হয়। এঘটনায় এস.আই মোঃ শাখাওয়াত বাদী হয়ে ৭-৮ জন কে অজ্ঞাত নামা ব্যাক্তি কে আসামী কের একটি মামলা দায়ের করে। মামলা নং-০৮। তারিখ ২৭/০৪/২০২৬।
ভোলাহাটের রাতের অন্ধকারে ধরা পড়া এই ডিজেল কারবার এখন শুধু পাচারের ঘটনা নয়- জ্বালানি খাতের আড়ালের অস্বচ্ছ বাণিজ্য নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিল।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 



















