ঢাকা ০৯:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার’, আসলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট! চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে ‘অবরুদ্ধ করে’ পিটুনি, আহত ৭; সাংবাদিক-পুলিশও লাঞ্ছিত “মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নয়”- তথ্যমন্ত্রী শিবগঞ্জে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগুনের খেলায় মেতে উঠল শিশুরা মাগুরায় শুরু দুই দিনব্যাপী “হাজরাপুরী লিচু মেলা-২০২৬” দেবিদ্বারে ছেলের পিটুনিতে বাবার মৃত্যু পাটগ্রাম সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক, জব্দ ৭ পাসপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনে গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে বৃদ্ধ স্বামী খুন, স্ত্রী আটক

পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলে বোরো বিপর্যয়

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে সুনামগঞ্জের ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান।সংগৃহীত ছবি।

টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে লাখো কৃষক চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়া, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতার কারণে পাকা ও আধাপাকা ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক চোখের সামনে তাদের সারা বছরের কষ্টের ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। হাওরজুড়ে এখন বিরাজ করছে এক ধরনের নীরব হাহাকার।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে, যদিও কৃষকদের দাবি এই ক্ষতির পরিমাণ আড়াই হাজার হেক্টরেরও বেশি।

অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন,“শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারিনি। অল্প কিছু কেটেছি, বাকিটা পানির নিচে চলে গেলো। মনে হয় না আর কিছু রক্ষা করতে পারমু।”

গত ২৪ ঘণ্টায় নিকলী এলাকায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরও কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৮-৯ লাখ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৪ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমির অধিকাংশই পানির নিচে। উজান থেকে আসা ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টির পানিতে হাওরের পানি দ্রুত বাড়ছে, ফলে নিষ্কাশনের সুযোগ নেই।

কৃষকদের অভিযোগ, পানির চাপ ও শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক ধান কাটলেও তা শুকাতে না পেরে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে।

লাখাই উপজেলার কৃষক রফিক মিয়া বলেন,“সারা বছরের ফসল চোখের সামনে তলিয়ে গেলো। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব বুঝতেছি না।”

মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়া বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাকালুকি হাওর এলাকাতেও শত শত হেক্টর জমির ধান পানির নিচে।

নেত্রকোনায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে হাওরের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার প্রায় অর্ধেক ধানক্ষেত এখনো কাটা হয়নি, যার বেশিরভাগই পানির নিচে।

কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো ভয়াবহ অকাল বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টিতে ২২১ হেক্টর বোরো ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি এবং ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমসহ বিভিন্ন ফল ঝরে পড়ায় কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।

কৃষি বিভাগ আগেই ৮০ শতাংশ ধান পাকার পর দ্রুত কাটার পরামর্শ দিলেও টানা বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকায় হারভেস্টার মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না জমিতে পানি জমে থাকার কারণে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ক্ষতি অনিবার্য।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত সরকারি প্রণোদনা, ঋণ মওকুফ এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ফসলহানির কারণে চলতি বছর গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দ্রুত ফসল কাটার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতি বছরই এ ধরনের দুর্যোগে কৃষকদের একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি

পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলে বোরো বিপর্যয়

প্রকাশের সময়ঃ ১২:১৯:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ কৃষি বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে লাখো কৃষক চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়া, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতার কারণে পাকা ও আধাপাকা ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক চোখের সামনে তাদের সারা বছরের কষ্টের ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। হাওরজুড়ে এখন বিরাজ করছে এক ধরনের নীরব হাহাকার।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে, যদিও কৃষকদের দাবি এই ক্ষতির পরিমাণ আড়াই হাজার হেক্টরেরও বেশি।

অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন,“শ্রমিকের অভাবে ধান কাটতে পারিনি। অল্প কিছু কেটেছি, বাকিটা পানির নিচে চলে গেলো। মনে হয় না আর কিছু রক্ষা করতে পারমু।”

গত ২৪ ঘণ্টায় নিকলী এলাকায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরও কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার ২০টি হাওরের অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৮-৯ লাখ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৪ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি জমির অধিকাংশই পানির নিচে। উজান থেকে আসা ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টির পানিতে হাওরের পানি দ্রুত বাড়ছে, ফলে নিষ্কাশনের সুযোগ নেই।

কৃষকদের অভিযোগ, পানির চাপ ও শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক ধান কাটলেও তা শুকাতে না পেরে মাঠেই নষ্ট হচ্ছে।

লাখাই উপজেলার কৃষক রফিক মিয়া বলেন,“সারা বছরের ফসল চোখের সামনে তলিয়ে গেলো। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব বুঝতেছি না।”

মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়া বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাকালুকি হাওর এলাকাতেও শত শত হেক্টর জমির ধান পানির নিচে।

নেত্রকোনায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে হাওরের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার প্রায় অর্ধেক ধানক্ষেত এখনো কাটা হয়নি, যার বেশিরভাগই পানির নিচে।

কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো ভয়াবহ অকাল বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টিতে ২২১ হেক্টর বোরো ধান, ৬৩ হেক্টর সবজি এবং ৫৪৮ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমসহ বিভিন্ন ফল ঝরে পড়ায় কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।

কৃষি বিভাগ আগেই ৮০ শতাংশ ধান পাকার পর দ্রুত কাটার পরামর্শ দিলেও টানা বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অনেক এলাকায় হারভেস্টার মেশিনও ব্যবহার করা যাচ্ছে না জমিতে পানি জমে থাকার কারণে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ক্ষতি অনিবার্য।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত সরকারি প্রণোদনা, ঋণ মওকুফ এবং পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ফসলহানির কারণে চলতি বছর গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দ্রুত ফসল কাটার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতি বছরই এ ধরনের দুর্যোগে কৃষকদের একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।