
একটি ছিল স্কুলের শিশু শিক্ষার্থী, অন্যজন ছিল বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরী-দুজনেরই ছিল রঙিন স্বপ্ন, হাসি আর আপনজনদের ভালোবাসায় ঘেরা ছোট্ট পৃথিবী। কিন্তু এক নির্মম দুপুরে সেই পৃথিবী থেমে গেল পানির গভীরে। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় পুকুরে ডুবে জিহাদ (৬) ও সুইটি (১৪) নামে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৮ মে) দুপুরে উপজেলার নগর হাওলা ও দক্ষিণ ধনুয়া এলাকায় ঘটে হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনা।
স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবেশীদের কান্না আর নিথর দুটি ছোট্ট দেহ-দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
খেলতে গিয়ে আর ফেরা হলো না ছোট্ট জিহাদের-নিহত জিহাদ (৬) উপজেলার নগর হাওলা গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে। সে স্থানীয় নগর হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের আদরের সন্তান জিহাদ প্রতিদিনের মতোই শুক্রবার দুপুরে বাড়ির পাশেই খেলছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায় জিহাদ। দীর্ঘ সময় তাকে খুঁজে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে পুকুরপাড়ে পড়ে থাকা ছোট্ট জুতাজোড়া দেখে আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে জিহাদকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত তাকে জৈনা বাজারের আল বারাকা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একজন প্রতিবেশী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“একটু আগেও খেলছিল, হাসছিল। কে জানত এটাই ওর শেষ খেলা হবে!”
বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারাল সুইটি-অন্যদিকে একই সময়ে উপজেলার দক্ষিণ ধনুয়া এলাকায় ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। নিহত সুইটি (১৪) ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার সাখুয়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পরিবারসহ শ্রীপুরের দক্ষিণ ধনুয়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল তারা। তার বাবা-মা স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুইটি বাকপ্রতিবন্ধী ছিল, তবে ছিল ভীষণ শান্ত স্বভাবের।
শুক্রবার দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে নামে সুইটি। এ সময় সঙ্গে থাকা এক শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই পানির নিচে তলিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্থানীয় এক কৃষক তাকে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে—নিথর হয়ে পড়ে ছিল সুইটির ছোট্ট শরীর।
এক প্রতিবেশী বলেন,“মেয়েটা কথা বলতে পারত না, কিন্তু সবার সঙ্গে হাসিমুখে থাকত। আজ ওর নিথর দেহ দেখে কারও চোখে পানি ধরে রাখা যাচ্ছে না।”
এই দুই মৃত্যুর পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিশেষ করে স্কুলসংলগ্ন ও আবাসিক এলাকার পুকুরগুলো দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। অধিকাংশ পুকুরের চারপাশে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী, দেয়াল বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, ফলে শিশুরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শিশুদের নিরাপত্তায় জরুরি ভিত্তিতে পুকুর ঘিরে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, না হলে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা আরও ঘটতে পারে।
দুই শিশুর এই অকাল মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল—এক মুহূর্তের অসতর্কতা, আর অরক্ষিত জলাশয় কেড়ে নিতে পারে একটি পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মুখটি। শ্রীপুরের দুই পরিবারে এখন শুধু কান্না, শূন্যতা আর অপূর্ণ থেকে যাওয়া হাজারো স্বপ্নের গল্প।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 



















