
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের সাকোকাঠি মিশুক স্ট্যান্ড থেকে বাটাজোর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওয়াপদা খাল দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের জারি করা নির্দেশনা এখন জনমনে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। খালের দুই পাড়ের ৫০ ফুটের মধ্যে থাকা অবৈধ স্থাপনা তিন দিনের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো উচ্ছেদ অভিযান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কাগুজে নির্দেশনার বিপরীতে বাস্তবে প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বরং খাল পুনঃখননের নামে সাধারণ মানুষের জমি, গাছপালা ও বসতঘরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল করে থাকা ব্যক্তিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ মে খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট, টিনশেড স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামো তিন দিনের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা জারি করা হয়। ওই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপনা অপসারণ না করলে প্রশাসন নিজ উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খালের দুই পাড়ে এখনো আগের মতোই দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য দোকানপাট, আধাপাকা স্থাপনা ও ব্যক্তিমালিকানার অবৈধ অবকাঠামো। কোথাও কোথাও নতুন করেও স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সাকোকাঠি-চন্দ্রহার-বাটাজোর ওয়াপদা খালটি একসময় এলাকার কৃষি, মৎস্য ও নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর অবৈধ দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো মানুষ।
বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে খাল পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতেই কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ—পুনঃখননের প্রকৃত সুফল পেতে হলে আগে খালটি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে খালটি দখল হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দখলমুক্ত করার ঘোষণা এলেও রহস্যজনক কারণে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন,
“খাল খননের সময় সাধারণ মানুষের গাছ কাটা হচ্ছে, বাড়ির অংশ ভাঙা হচ্ছে। কিন্তু যারা বছরের পর বছর খাল দখল করে ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। তাহলে আইন কি শুধু গরিব মানুষের জন্য?”
আরেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রশাসনের নির্দেশনা দেখে আমরা ভেবেছিলাম এবার সত্যিই খাল দখলমুক্ত হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা শুধু লোক দেখানো ঘোষণা। প্রভাবশালীদের কারণে কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, খালের দুই পাড় দখল হয়ে যাওয়ায় সড়ক সংকুচিত হচ্ছে এবং যানজট বাড়ছে। এছাড়া বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আশপাশের বহু ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়।
পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল ও জলাশয় দখলমুক্তে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলেও গৌরনদীতে এখনো দৃশ্যমান অভিযান না হওয়ায় জনমনে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। তারা দ্রুত যৌথ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, খাল দখলমুক্তে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে এবং পর্যায়ক্রমে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সৈয়দ নুর আহছান, বরিশাল 



















