
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার প্রচলিত রীতি উপেক্ষা করে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে নেওয়া এই উদ্যোগকে ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জানুয়ারি মাসে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত পাঠদান কার্যক্রম কিছুটা শিথিল থাকে। এ সময় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম চলমান থাকে। এর মধ্যেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের পরপরই শুরু হবে পবিত্র রমজান মাস এবং ঈদুল ফিতরের ছুটি। ফলে চলতি বছর প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদান ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্যকর সময় পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ আট মাস।
তাঁদের মতে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে শিক্ষাক্রম বা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। সে ক্ষেত্রে মাত্র এক বছর পরই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক স্তরের নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির একটি খসড়া ইতোমধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চূড়ান্ত করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে, নাকি চলতি বছরের জন্য স্থগিত রাখা হবে—সে সিদ্ধান্তের জন্য এটি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বিদ্যালয়) রেবেকা সুলতানা জানান, খসড়াটি পর্যালোচনার জন্য ১৩ জানুয়ারি একটি বিশেষ সভা আহ্বান করা হয়েছে। ওই সভাতেই চলতি বছর থেকে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করা হবে, নাকি তা স্থগিত থাকবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদরা জানান, প্রস্তাবিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বেশ কিছু নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক মূল্যায়নে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা, ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের কাজ সম্পন্ন করা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তা, বিষয়বস্তুর বোধগম্যতা এবং ক্লাস টেস্টের ভিত্তিতে মূল্যায়ন। তবে চলতি বছরই এসব পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে গেলে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে এবং মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁরা আরও বলেন, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকর করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যা সম্পন্ন করতে অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে। এতে বাস্তবে পাঠদান কার্যক্রম ছয় মাসে নেমে আসবে, যা কার্যকর মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়।
নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের মতে, চলতি বছরে কোনোভাবেই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। বরং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে এটি চালু করা হলে মূল্যায়নের উদ্দেশ্য সফল হবে।
অভিভাবকরা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৩ সালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন শিক্ষাক্রম চালু করায় শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার সেই শিক্ষাক্রম থেকে সরে আসে। এমন বাস্তবতায় এক বছরের ব্যবধানে আবারও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 
























