
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর এই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার এক ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতার কথা উঠে এসেছে।
সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়েও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তারেক রহমানের এই বক্তব্য তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতায় নতুন একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মাতৃভাষায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য
নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন হলে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের সভাপতিকে সম্বোধন করে তিনি নিজের পরিবারের আগের দুই সদস্যের এই বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার স্মৃতিচারণ করেন।
ভাষণে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’
নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বার্থের পাশাপাশি একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
জলবায়ু, বিশ্বশান্তি ও রোহিঙ্গা সংকটে গুরুত্ব
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
ভাষণে বিশেষ গুরুত্ব পায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো।
এ ছাড়া মানবিক সংকট ও রোহিঙ্গা সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
১৯৮০ সালে জাতিসংঘে ভাষণ দেন জিয়াউর রহমান
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তারেক রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাষণের ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন জিয়াউর রহমান। সে সময় তাঁর বক্তব্যে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং দেশগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
জিয়াউর রহমানের সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল।
খালেদা জিয়ার একাধিকবার জাতিসংঘে ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একাধিকবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তিনি। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মোট পাঁচবার বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সভা, ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে সাধারণ পরিষদের ৬০তম অধিবেশন চলাকালে দুটি পৃথক সভায় বক্তব্য দেন তিনি।
জাতিসংঘে পরিবারের তিন সদস্যের বক্তব্যের ধারাবাহিকতা
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—এই তিনজনের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা একই পরিবারের তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।
তারেক রহমানের ভাষণে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ায় তাঁর বক্তব্যে দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ—দুই দিকই উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে বাংলায় দেওয়া তাঁর বক্তব্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মাতৃভাষার ব্যবহার এবং দেশের স্বার্থ তুলে ধরার বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
অধিকার ডেস্কঃ 






















