ঢাকা ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াতের বিশাল জয়ের নেপথ্যে বিএনপির কোন্দল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর-৩ আসন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। বৃহস্পতিবার ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে তিনি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হারুনুর রশীদ পান ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট। প্রায় ৬২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধান স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টিতেই জামায়াত এগিয়ে ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের তৎপরতা এবং সামাজিক কার্যক্রম ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

সুজনের উপজেলা সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিক আসাদ বলেন, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ছিল। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিতর্ক না থাকাও ভোটারদের আস্থায় ভূমিকা রাখতে পারে। জেলা সভাপতি মো. আসলাম কবিরের মতে, সংগঠনের কাঠামোগত শক্তি, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ইস্যুতে সুসংগঠিত প্রচারণা জয়কে সহজ করেছে।

অন্যদিকে বিএনপির ভেতরে সাংগঠনিক অসন্তোষ ও বিভাজনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রার্থীর সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের দূরত্ব এবং সমন্বয়ের ঘাটতি ভোটে প্রভাব ফেলেছে। জেলা আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়াও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তবে হারুনুর রশীদ পাল্টা অভিযোগে বলেন, জেলা কমিটি তার সঙ্গে সমন্বয় করেনি এবং কাঠামোগত জটিলতা প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত আগে থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে ধারাবাহিক গণসংযোগ চালিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশলও কার্যকর হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু—বিশেষ করে ধর্মীয় ও সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট মনোভাব—নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির পরাজয়ের দায় নিয়ে জেলা কমিটির মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, হারুনুর রশীদ ২০১৮ সালের পর এলাকায় ছিলেন না এবং ৫ আগস্টের পর ফিরে এসে দলের নেতাকর্মীদের বদলে আওয়ামী লীগ ও কৃষক লীগ নেতাদের নিয়ে মাঠে নামায় সাধারণ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

জেলা আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা তারেক রহমানের গঠিত কমিটি হলেও হারুন সাহেব আমাদের মানেন না এবং যোগাযোগও করেননি।’ এমনকি রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতও কোন্দলের কারণে একবারের জন্যও মাঠে আসেননি। হারুনুর রশীদ পাল্টা অভিযোগে জানিয়েছিলেন, এই আহ্বায়ক কমিটি ঢাকা থেকে চাপিয়ে দেওয়া এবং তারা জামায়াত-আওয়ামী লীগের লোক। তাই তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

অন্যদিকে, জামায়াতের কৌশলী অবস্থান ও হিন্দু সম্প্রদায়কে কাছে টানার বিষয়টিও নজর কেড়েছে। জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাইফুল ইসলাম রেজা জানান, জামায়াত এক বছর আগে প্রার্থী নিশ্চিত করে মাঠে নেমেছিল এবং ৫ আগস্টের পর নিবিড় গণসংযোগ চালিয়েছে। পাশাপাশি সাবেক জামায়াত নেতা লতিফুর রহমানের মাধ্যমে আওয়ামী ঘরানার ভোটের একটি অংশ নিজেদের বাক্সে তুলতে সক্ষম হয় দলটি।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতও সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা স্বীকার করে বলেন, মাঠপর্যায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ না করায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন ধরে একটি দলের প্রভাব থাকা এ আসনে এবারের ফলাফল রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জামায়াতের বিশাল জয়ের নেপথ্যে বিএনপির কোন্দল

প্রকাশের সময়ঃ ০১:১৫:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও ঢাকা দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল। বৃহস্পতিবার ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে তিনি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হারুনুর রশীদ পান ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট। প্রায় ৬২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধান স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টিতেই জামায়াত এগিয়ে ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি, ধারাবাহিক মাঠপর্যায়ের তৎপরতা এবং সামাজিক কার্যক্রম ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

সুজনের উপজেলা সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিক আসাদ বলেন, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও জামায়াত তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ছিল। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিতর্ক না থাকাও ভোটারদের আস্থায় ভূমিকা রাখতে পারে। জেলা সভাপতি মো. আসলাম কবিরের মতে, সংগঠনের কাঠামোগত শক্তি, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ইস্যুতে সুসংগঠিত প্রচারণা জয়কে সহজ করেছে।

অন্যদিকে বিএনপির ভেতরে সাংগঠনিক অসন্তোষ ও বিভাজনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রার্থীর সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের দূরত্ব এবং সমন্বয়ের ঘাটতি ভোটে প্রভাব ফেলেছে। জেলা আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়াও সংগঠনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তবে হারুনুর রশীদ পাল্টা অভিযোগে বলেন, জেলা কমিটি তার সঙ্গে সমন্বয় করেনি এবং কাঠামোগত জটিলতা প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত আগে থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে ধারাবাহিক গণসংযোগ চালিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশলও কার্যকর হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু—বিশেষ করে ধর্মীয় ও সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট মনোভাব—নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির পরাজয়ের দায় নিয়ে জেলা কমিটির মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, হারুনুর রশীদ ২০১৮ সালের পর এলাকায় ছিলেন না এবং ৫ আগস্টের পর ফিরে এসে দলের নেতাকর্মীদের বদলে আওয়ামী লীগ ও কৃষক লীগ নেতাদের নিয়ে মাঠে নামায় সাধারণ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

জেলা আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘আমরা তারেক রহমানের গঠিত কমিটি হলেও হারুন সাহেব আমাদের মানেন না এবং যোগাযোগও করেননি।’ এমনকি রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতও কোন্দলের কারণে একবারের জন্যও মাঠে আসেননি। হারুনুর রশীদ পাল্টা অভিযোগে জানিয়েছিলেন, এই আহ্বায়ক কমিটি ঢাকা থেকে চাপিয়ে দেওয়া এবং তারা জামায়াত-আওয়ামী লীগের লোক। তাই তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।

অন্যদিকে, জামায়াতের কৌশলী অবস্থান ও হিন্দু সম্প্রদায়কে কাছে টানার বিষয়টিও নজর কেড়েছে। জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাইফুল ইসলাম রেজা জানান, জামায়াত এক বছর আগে প্রার্থী নিশ্চিত করে মাঠে নেমেছিল এবং ৫ আগস্টের পর নিবিড় গণসংযোগ চালিয়েছে। পাশাপাশি সাবেক জামায়াত নেতা লতিফুর রহমানের মাধ্যমে আওয়ামী ঘরানার ভোটের একটি অংশ নিজেদের বাক্সে তুলতে সক্ষম হয় দলটি।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতও সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা স্বীকার করে বলেন, মাঠপর্যায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ না করায় কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন ধরে একটি দলের প্রভাব থাকা এ আসনে এবারের ফলাফল রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।