
বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক মাসের ব্যবধানে ২৫২ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজির সিলিন্ডার এখন ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ দাম কার্যকর হয়েছে।
তবে সরকারি নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সরবরাহ ও দামে স্বাভাবিকতা ফেরেনি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকার গণ্ডি ছাড়িয়েছে।
এলপিজি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লিংক রোড এলাকায় সিএনজি চালকেরা প্রায় দুই ঘণ্টা সড়কে অবস্থান নেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
যে কারণে এলপিজির দাম বেড়েছে
বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির অন্যতম প্রধান মূল্যসূচক সৌদি আরামকোর সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি) বেড়ে যাওয়ায় অক্টোবরের জন্য নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
অক্টোবরে প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রোপেন ও বিউটেনের ৩৫:৬৫ অনুপাত ধরে বিইআরসি গড় সৌদি সিপি হিসাব করেছে প্রতি টন ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার।
এর আগে সেপ্টেম্বরে প্রোপেনের দাম ছিল প্রতি টন ৬২৫ ডলার এবং বিউটেনের ৬৬০ ডলার। ওই মাসে গড় সৌদি সিপি ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসে গড় সৌদি সিপি বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার।
এলপিজির নতুন মূল্য নির্ধারণে আমদানির সময় জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়ামও বিবেচনায় নিয়েছে কমিশন। অক্টোবরের হিসাবে এ খাতে প্রতি টনে ২৫০ ডলার ধরা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১৬০ ডলার। ফলে এক মাসে এ ব্যয়ও প্রতি টনে ৯০ ডলার বেড়েছে।
অন্যদিকে অক্টোবরের মূল্য নির্ধারণে প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ধরা হয়েছে ১২৩ টাকা ১৮ পয়সা। সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা।
এলপিজির পাশাপাশি অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে।
তবে সরকারি কোম্পানির ১২ দশমিক ৫ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আগের মতোই ৮২৫ টাকা রাখা হয়েছে। কিন্তু সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের বড় অংশ এই দামের সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না।
সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ
এলপিজির বাজারে সংকটের কারণ নিয়ে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকেরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ থাকার অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
তবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আমদানিকারকেরা। জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে তাঁরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম এবং জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। তারপরও তাঁরা বিইআরসির নির্ধারিত দরে পরিবেশকদের কাছে এলপিজি সরবরাহ করছেন বলে দাবি করেন।
আমদানিকারকদের বক্তব্য, কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা পরিবেশক বা খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে হতে পারে।
বাজারে সরবরাহের প্রকৃত চিত্র জানতে সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। রোববার পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তথ্য জমা দিয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, তথ্য পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মুন্সীগঞ্জে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহে দাম উঠেছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, কোথাও কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লায় প্লাস্টিকের সিলিন্ডার ২ হাজার ১৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং স্টিলের সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। বগুড়ায় নতুন মূল্য ঘোষণার পর কিছু দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহীর কাজলা ও ভদ্রা এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়। একই সঙ্গে সেখানে সরবরাহ সংকটের কথাও জানিয়েছেন বিক্রেতারা। চারঘাটের কয়েকটি দোকানে গ্যাস নেই বলা হলেও মজুত সিলিন্ডার পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বরিশালেও নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগেই ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাচ্ছেন না।
রংপুরে কয়েক দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে। ওমেরা ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৪০ টাকা এবং আইগ্যাস ১ হাজার ৮২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও এসব সিলিন্ডারের দাম যথাক্রমে ১ হাজার ৬২০ ও ১ হাজার ৫৪০ টাকা ছিল।
গাইবান্ধার ছোট বিক্রেতারাও পর্যাপ্ত সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। একটি ডিলার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে কত পরিমাণ সিলিন্ডার সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে কোম্পানি এখনো নিশ্চিত করেনি।
বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের খরচও বেড়েছে
শুধু বাসাবাড়ির গ্রাহক নয়, এলপিজিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বাড়তি খরচের মুখে পড়েছে। ময়মনসিংহে ৩০ ও ৪৫ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের তুলনায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একটি রেস্তোরাঁয় মাসে প্রায় ২০টি বড় সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি সিলিন্ডারে অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হলে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
অনিয়ম ঠেকাতে অভিযান
এলপিজি বিক্রিতে অনিয়ম ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
মুন্সীগঞ্জে রোববার তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এলপিজি বিক্রেতাকে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গাইবান্ধায় তিনটি দোকানকে মোট ৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং বরিশালে দুটি দোকানকে মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সাভারের আশুলিয়ায় অভিযানে একটি প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়-বিক্রয় চালানের তথ্যের অসংগতির কারণে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত দামে বিক্রি, বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তর এবং সিলিন্ডারে পানি দেওয়ার অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে এলপিজির আমদানি, সরবরাহ ও খুচরা বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে বিইআরসি। বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক এবং নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
অধিকার ডেস্কঃ 




















