
কুমারপাড়া-তাঁতীপাড়ায় টিম-৪-এর অভিযান; জলাধার পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতায় জোর। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জমে থাকা পানি অপসারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কুমারপাড়া ও তাঁতীপাড়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে পৌরসভার টিম-৪।
অভিযানে বিভিন্ন জলাধার ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে জমে থাকা বৃষ্টির পানি অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে বাড়িঘর ও জলাধারের মালিকদের পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
পৌরসভার উদ্যোগে পরিচালিত এ অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটসের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
জমে থাকা পানিতে নজর, অপসারণ করা হলো জলাধারের পানি
অভিযান চলাকালে এলাকার কয়েকটি জলাধারে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। পৌরসভার টিম-৪-এর সদস্যরা এসব জলাধারে জমে থাকা পানি সরিয়ে দেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষকে ভবিষ্যতে জলাধার বা আশপাশে যাতে পানি জমে এডিস মশার প্রজননের পরিবেশ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিদর্শনের সময় জলাধারের আশপাশে কিছু মশা উড়তে দেখা গেলেও সেখানে মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে তা এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই জলাধার, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা কিংবা খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রজননস্থল খুঁজে মাঠে পৌরসভার টিম
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন নয়, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করাকেও অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়।
এ সময় বাড়ির আঙিনা, গলি, খোলা জায়গা, জলাধার ও আশপাশের পরিবেশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। একই সঙ্গে মশার বংশবিস্তারের সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন জেলা গণপূর্ত দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার দেব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ মো. ইমরান হোসাইন এবং দৈনিক চাঁপাই দর্পণের প্রতিনিধি মো. ইসাহাক আলী।
এ ছাড়া পৌরসভার অফিস সহকারী মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বিল ক্লার্ক মো. সেরাজুল ইসলাম, ইউসুফ, ফয়সাল, মেহেদী, আরাফাত ও আফজালসহ সংশ্লিষ্টরা অভিযানে অংশ নেন।
রেড ক্রিসেন্টের সদস্য মোসাঃ তানজিলা খাতুন, মোঃ এ্যানি খাতুন ও মোসাঃ খুসি আরা খাতুন এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউটসের সদস্যরা পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।
বাড়ির আঙিনা থেকে ছাদ—যেখানে পানি, সেখানেই নজর
সংশ্লিষ্টদের মতে, এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই শুধু বড় জলাধার নয়, বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত ক্যান, বোতল, প্লাস্টিকের সামগ্রী কিংবা ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে আটকে থাকার প্রবণতা বাড়ে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা, দোকানের আশপাশ কিংবা খোলা স্থানে পড়ে থাকা পাত্রেও পানি জমে থাকতে পারে। এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বাড়ির ভেতর-বাইরের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লিফলেট বিতরণ, সচেতনতার বার্তা
অভিযানের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়। পৌরসভার প্রচারণায় ‘বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করি, করিব ডেঙ্গু প্রতিকার’—এমন বার্তার মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
স্থানীয়দের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পাশাপাশি ছাদ, বারান্দা, বাগান, ফুলের টব ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা ফেলে দেওয়া অথবা এমনভাবে সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে সেখানে পানি জমতে না পারে।
সপ্তাহে এক দিন ‘পানি খোঁজার’ অভিযান ঘরেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু পৌরসভার অভিযানের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদের নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিয়েছেন, সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, জলাধার ও আশপাশের খোলা জায়গা ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। কারণ সামান্য পরিমাণ জমে থাকা পানিও মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
শুধু অভিযান নয়, দরকার নাগরিকেরও দায়িত্ব
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত নজরদারি এবং নাগরিক সচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। পৌরসভা অভিযান চালিয়ে সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু বাড়ির ভেতর কিংবা ব্যক্তিগত জায়গায় পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত অপসারণের দায়িত্ব নাগরিকদেরও নিতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিম-৪-এর এ অভিযান সেই বার্তাই সামনে এনেছে—ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মশা মারার অভিযান নয়, মশার জন্মের জায়গা বন্ধ করার লড়াইও।
জলাধার থেকে বাড়ির ছাদ, ফুলের টব থেকে পরিত্যক্ত বোতল—কোথাও জমে থাকা পানি যেন এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বছরজুড়ে পরিচ্ছন্নতাই হতে পারে বড় প্রতিরোধ
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু মৌসুমি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, সম্ভাব্য প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা—এই চারটি বিষয়কে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ করতে হবে।
পৌরসভার মাঠপর্যায়ের অভিযান যেমন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিজেদের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এডিস মশার বিস্তার ঠেকাতে বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা নয়—বাড়ির আশপাশে একটুখানি জমে থাকা পানিও এখনই সরিয়ে ফেলা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ।
নিজস্ব প্রতিনিধঃ 





















