
জমির নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনও অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। হাতে লেখা বালাম বই, দলিলের নকল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং জমি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের মতো সেবা অনলাইনে পাওয়া গেলেও জমি নিবন্ধনে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবস্থা এখনও কার্যকর হয়নি।
জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করতে পরে নামজারি করতে হয়। নামজারির আবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রতিবেদন, শুনানি এবং নতুন খতিয়ান তৈরির মতো বিভিন্ন ধাপ এখন অনলাইনে পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধন ও নামজারি একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত না থাকায় তথ্য যাচাই এবং জমির মালিকানা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা থেকে যাচ্ছে।
বর্তমানে অনেক সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে নিবন্ধিত দলিলের তথ্য হাতে লিখে বালাম বইয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেই তথ্য পাঠ ও যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে দলিলের নকল সংগ্রহ করতে হয়। পুরোনো এই প্রক্রিয়ায় হাতের লেখা অস্পষ্ট হওয়া, তথ্য যাচাইয়ে সময় লাগা এবং দীর্ঘদিন পর নথি খুঁজে পেতে সমস্যার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, নামজারি ব্যবস্থা অনলাইনে হওয়ায় আবেদনকারীরা আবেদনের অগ্রগতি জানতে পারেন। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ এবং ভূমিসংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রেও ডিজিটাল সেবা চালু রয়েছে। ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে থাকায় সেবার মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
জমি কেনার আগে সেটি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নামজারি সম্পন্ন না হলে জমির সর্বশেষ মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য সহজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে সংরক্ষিত পুরোনো দলিল ঘেঁটে তথ্য বের করাও সময়সাপেক্ষ। এতে একই জমি একাধিকবার বিক্রির মতো অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৩ ধারায় নিবন্ধিত দলিলকে নোটিশ হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। ফলে জমি হস্তান্তরের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে না পারলে পরবর্তী ক্রেতা আইনি ও আর্থিক জটিলতায় পড়তে পারেন। জীবনের সঞ্চয় দিয়ে জমি কেনার পর মালিকানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সেবা চালুর ফলে পুরোনো রেকর্ড ও তথ্য অনুসন্ধান আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। তবে অনলাইন রেকর্ডেও ভুল বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কত দিন ধরে অনিষ্পন্ন আছে—এসব তথ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২১ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় ১৭টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে অনলাইন জমি নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এবং প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরাও আর দায়িত্বে নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার কথাও জানা গেছে।
নতুন উদ্যোগ সফল করতে আগের প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। পাশাপাশি নিবন্ধন ও নামজারি ব্যবস্থাকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে জমির মালিকানা, হস্তান্তরের ইতিহাস এবং ভূমি রেকর্ড যাচাই আরও সহজ ও স্বচ্ছ হতে পারে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ১০ হাজার ২১৪ জন নামজারি আবেদনকারীর নথি পর্যালোচনার তথ্য তুলে ধরা হয়। তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিমের করা জরিপে দলিলে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি জমি বিক্রি, জমির শ্রেণি, দাগ ও খতিয়ান নম্বর এবং দাতার নামসংক্রান্ত বিভিন্ন ত্রুটি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট ৭৯ শতাংশ আবেদনকারীর কাগজপত্রে কোনো না কোনো ত্রুটি ছিল।
এ ধরনের ত্রুটি কমাতে নিবন্ধন ও নামজারি ব্যবস্থার মধ্যে তথ্যের সমন্বয় জরুরি। একই প্ল্যাটফর্মে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাই করা গেলে দলিলের অসংগতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি দলিল লেখক ও বালাম লেখকদের জন্য ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রের আদলে লাইসেন্সভিত্তিক পৃথক ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
শুধু সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির পদ্ধতি পরিবর্তন করে এ খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রক্রিয়াগত সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে সরকারি সেবার এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ পুরোনো পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়া সেবার মান উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে একই ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা গেলে সাধারণ মানুষ আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ সেবা পেতে পারেন। এতে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ও হয়রানি কমানোর পাশাপাশি ভূমি খাতে অনিয়ম প্রতিরোধেও সহায়তা মিলতে পারে।
লেখক: মুহাম্মদ আবু সাঈদ, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অধিকার ডেস্কঃ 

























