রাজশাহীতে বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে। নিউজিল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে জেলার মোহনপুর ও বাগমারা উপজেলার সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ঘটনার প্রতিবাদে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর একটি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগীরা। সেখানে তারা দাবি করেন, বিদেশে পাঠানোর নামে তাদের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি আদায় করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোহনপুর থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রণব কুমার সাহা জানান, প্রায় এক বছর আগে ভুট্টো মৃধা নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ভুট্টো নিজেকে মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের চক বিরহী গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমানের হয়ে কাজ করেন এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানো সম্ভব।
তার কথায় বিশ্বাস করে নিউজিল্যান্ডে পাঠানোর জন্য ১৪ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। চারজনের কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে নেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। এ সময় তাদের নামে পৃথক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্রও করা হয়। তবে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে গিয়ে তারা জানতে পারেন, দেওয়া সব কাগজপত্রই জাল। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহনপুর উপজেলার চক বিরহী এলাকায় আরও অনেক মানুষ একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
মির্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, প্রায় ছয় মাস আগে তাকে লাওসে পাঠানোর প্রস্তাব দেন মশিউর রহমানের বড় ভাই মতিউর রহমান। মতিউর রহমান কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক এবং স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি। তার কথায় বিশ্বাস করে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে কালামসহ কয়েকজন লাওসে যেতে সম্মত হন। পরে ১২ জনকে ওই দেশে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে তারা কোনো কাজ পাননি। নানা দুর্ভোগের পর তারা দেশে ফিরে আসেন।
এদিকে, কম্বোডিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে চার যুবকের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে মোহনপুর থানায় পৃথক অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী সামিম পাঠান বলেন, পলাশ হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাকে কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। পরে সামিমসহ চারজন মিলে তাকে ২৪ লাখ টাকা দেন। দুই মাস পর তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, চাকরির ভিসা নয় বরং ট্যুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তাদের অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রায় ৮৭ দিন আটকে রেখে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আরও ৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরিবারের সহায়তায় সেই টাকা পরিশোধ করার পর তারা দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
দেশে ফিরে অভিযুক্তদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় পলাশ হোসেন, তার বাবা আনছার আলী ও মা মার্জিয়া বিবিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মোহনপুর ছাড়াও বাগমারা উপজেলার বাইগাছা ও সাঁইপাড়া এলাকার অনেক মানুষের কাছ থেকেও বিদেশে পাঠানোর নামে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিক কারণে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
অভিযোগের বিষয়ে ভুট্টো মৃধা বলেন, তিনি ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং এজন্য সময় প্রয়োজন। তার দাবি, প্রথমে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমানের মাধ্যমে এবং পরে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এক ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছেন।
এদিকে, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমান বর্তমানে আন্টার্কটিক মহাসাগরে একটি জাহাজে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।
কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক মতিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর কাজে তিনি সরাসরি জড়িত নন। তবে একটি গ্রুপ পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তার দাবি, ভুট্টো মৃধা তার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করেছে। যাদের সমস্যা হয়েছে তাদের নিজ খরচে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।
মোহনপুর থানার এসআই ইয়ামিন আলী বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণার বিষয়ে দুটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা বিনতে আখতার বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব সাত বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 




















