
পার্বত্য জেলা বান্দরবান এখন উৎসবের রঙে রঙিন। বর্ণিল পোশাক, পাহাড়ি বাদ্যযন্ত্রের তালে নৃত্য আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো শহর। মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব ‘সাংগ্রাই’ উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রা যেন রূপ নিয়েছে এক মহামিলনমেলায়, যেখানে পাহাড়ি-বাঙালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে অংশ নিয়েছেন।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে শহরের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খিয়াং, খুমি, বমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশ নেন। ঢোল, কাঁসি ও স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে আবার রাজার মাঠে গিয়ে শেষ হয়। পথে পথে মানুষের ভিড়, শুভেচ্ছা বিনিময় আর উৎসবের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থান দেশের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
আয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন। শোভাযাত্রা শেষে রাজার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
একই দিন সকালে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট-এ বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে অংশ নেন।
উৎসব আয়োজকরা জানান, ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া এই আয়োজন চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। চার দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে বুদ্ধস্নান, পিঠা উৎসব, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, তৈলাক্ত বাঁশে চড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘মৈত্রী পানি বর্ষণ’ বা জলকেলি।
মারমা সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরকে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে বরণ করার মধ্যেই সাংগ্রাইয়ের মূল তাৎপর্য নিহিত। প্রতি বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকদিনব্যাপী এই উৎসব উদযাপন করা হয়, যা ধীরে ধীরে পুরো পাহাড়জুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের আবহ তৈরি করে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংগ্রাই শুধু একটি ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব নয়—এটি পাহাড়ি জনজীবনের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং বহুজাতিক সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতীক। চার দিনব্যাপী এই আয়োজনকে ঘিরে এখন আনন্দে ভাসছে পুরো বান্দরবান, আর উৎসবটি পরিণত হয়েছে পাহাড়ের মানুষের সবচেয়ে বড় মিলনমেলায়।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 



















