
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা ও মহানন্দা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে তীব্র জ্বালানি তেল (ডিজেল) সংকটে কার্যত থমকে গেছে জনজীবন। শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকার ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষ পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। কয়েকদিন ধরে চলমান এ সংকটে নদীপথ প্রায় অচল হয়ে পড়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর আলাতুলী, দেবীনগর, ইসলামপুর ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। প্রতিদিন যেসব মানুষ রেলবাজার, হাটপাড়া, সুলতানগঞ্জ ও ফুলতলা ঘাট দিয়ে নৌপথে চলাচল করতেন, তারা এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহে কড়াকড়ি এবং অনানুষ্ঠানিক রেশনিং ব্যবস্থার কারণে মাঝিরা প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন কয়েকশ নৌকা চলাচল করলেও বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি নৌকা চলাচল করছে। একটি নৌকা চালাতে একবার যাতায়াতে যেখানে ৩ থেকে ৪ লিটার ডিজেল লাগে, সেখানে সেই পরিমাণ তেল জোগাড় করাই এখন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
এর ফলে শুধু যাতায়াতই নয়, থমকে গেছে চরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজারে যাওয়া, স্কুল-কলেজে উপস্থিতি—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের কলেজছাত্রী সুমাইয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“নৌকা না চলায় সময়মতো কলেজে যেতে পারছি না। যে দু-একটা নৌকা চলছে, তাতে গাদাগাদি করে উঠতে হয়। এতে পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
চর আলাতুলী ঘাটে দেখা যায় একই দুর্ভোগ। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে শহরে যাওয়ার জন্য ভোরে ঘাটে এসে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে আম্বিয়া নামের এক নারীকে। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন,
“আমাদের জীবন নদীর ওপর নির্ভরশীল। এখন সেই পথটাই বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা একরকম অবরুদ্ধ অবস্থায় আছি।”
মাঝিদের দুরবস্থাও কম নয়। রেলবাজার খেয়া ঘাটের মাঝি আবু তালেব বলেন,
“তেল নাই, নৌকা নামাতে পারি না। লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যায় না। আয় বন্ধ হয়ে গেছে, সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।”
হাটপাড়া ঘাটের মাঝি মোমিন জানান,
“যাত্রী থাকলেও তেল না থাকায় নৌকা ছাড়তে পারছি না। এতে পুরো আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”
নৌকা সংকটের কারণে যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। অনেককে জরুরি প্রয়োজনে দীর্ঘ পথ ঘুরে বিকল্প সড়কপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যেখানে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও কঠিন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তেলের সরবরাহে হঠাৎ কড়াকড়ি ও পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাবেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত রত্ন বলেন,
“জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন কাজ করছে। নৌকার ডিজেল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোথাও কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, নদীপথই তাদের জীবনের প্রধান ভরসা। সেই পথ অচল হয়ে পড়ায় তারা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও গভীর হবে—এমন আশঙ্কাই এখন সবার মুখে মুখে।
রাজশাহী প্রতিনিধি: 



















