ঢাকা ০৮:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি সাইনবোর্ডে ‘ডাক্তার’, আসলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট! চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে ‘অবরুদ্ধ করে’ পিটুনি, আহত ৭; সাংবাদিক-পুলিশও লাঞ্ছিত “মনগড়া প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে আর রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন নয়”- তথ্যমন্ত্রী শিবগঞ্জে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আগুনের খেলায় মেতে উঠল শিশুরা মাগুরায় শুরু দুই দিনব্যাপী “হাজরাপুরী লিচু মেলা-২০২৬” দেবিদ্বারে ছেলের পিটুনিতে বাবার মৃত্যু পাটগ্রাম সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক, জব্দ ৭ পাসপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর ভার্চুয়াল উদ্বোধনে গৌরনদীতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম শুরু পারিবারিক কলহের জেরে নাটোরে বৃদ্ধ স্বামী খুন, স্ত্রী আটক

হাওরে তলিয়ে স্বপ্ন, মাঠেই নিভল প্রাণ-ধান ডুবতে দেখে কৃষকের মৃত্যু

শনিবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের হাওর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

অতিবৃষ্টির পানিতে হাওরের ধান তলিয়ে যেতে দেখে হৃদয় ভেঙে পড়লেন কৃষক—আর সেই আঘাতই কেড়ে নিল প্রাণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধানখেতে নেমে নিজের সর্বস্ব ডুবে যাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে মারা গেছেন আহাদ মিয়া (৫৫) নামে এক কৃষক।

শনিবার সকালে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের হাওর এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত আহাদ মিয়া ওই গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে ছয় বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন আহাদ মিয়া। আর মাত্র কয়েকদিন পরই সেই ধান ঘরে তোলার কথা ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে জমির সব ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। তিন দিন ধরেও পানি না নামায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি।

শনিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে পানির নিচে থাকা ধান কাটতে যান আহাদ। কিন্তু মাঠে গিয়ে নিজের চোখে সব ধান ডুবে থাকতে দেখে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

আহাদের বড় ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আহম্মদ হোসেন বলেন, “সব ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে—এই দৃশ্যটা সে সহ্য করতে পারেনি। মাঠেই অসুস্থ হয়ে মারা গেল।”

ভাতিজা ফারুক মিয়া জানান, ঋণের টাকায় চাষ করা ফসল হারানোর শোকই তার চাচার মৃত্যুর প্রধান কারণ। “সব শেষ হয়ে গেছে—এই কষ্টটাই তিনি নিতে পারেননি,” বলেন তিনি।

এদিকে একই চিত্র গোটা নাসিরনগরের হাওরজুড়ে। জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, অন্তত এক হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পচে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা অপরিপক্ব ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে, যাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করে ধান কাটছেন কৃষকরা। কিন্তু পানির নিচে থাকায় অনেক ধানে ইতোমধ্যেই পচন ধরেছে, আবার অনেক ধান পুরোপুরি পাকে নি—ফলে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে বহুগুণে।

মহাকাল পাড়ার কৃষক আবু লাল মিয়া জানান, ২০ কানি জমিতে ধান করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কানি জমির ধান তুলতে পেরেছেন, বাকি ১৫ কানি এখনো পানির নিচে। “কি করব বুঝতে পারছি না,” অসহায় কণ্ঠে বলেন তিনি।

আরেক কৃষক আবু লাল বলেন, উচ্চ সুদে দাদন নিয়ে চাষ করেছিলেন। “ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করব—এই আশা ছিল। এখন সব পানির নিচে। সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছি না,” বলেন তিনি।

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সহায়তার জন্য পাঠানো হয়েছে। হাওরের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একদিকে পানিতে ডুবে যাচ্ছে সোনালি ফসল, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে কৃষকের স্বপ্ন—নাসিরনগরের হাওর যেন এখন এক নিঃশব্দ কান্নার নাম।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের থাবায় নিঃস্ব পরিবার: সন্তানের চিকিৎসায় বিক্রি হচ্ছে গরু, হারাচ্ছে চাকরি

হাওরে তলিয়ে স্বপ্ন, মাঠেই নিভল প্রাণ-ধান ডুবতে দেখে কৃষকের মৃত্যু

প্রকাশের সময়ঃ ০১:১৯:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

অতিবৃষ্টির পানিতে হাওরের ধান তলিয়ে যেতে দেখে হৃদয় ভেঙে পড়লেন কৃষক—আর সেই আঘাতই কেড়ে নিল প্রাণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধানখেতে নেমে নিজের সর্বস্ব ডুবে যাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে মারা গেছেন আহাদ মিয়া (৫৫) নামে এক কৃষক।

শনিবার সকালে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের হাওর এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত আহাদ মিয়া ওই গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে ছয় বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন আহাদ মিয়া। আর মাত্র কয়েকদিন পরই সেই ধান ঘরে তোলার কথা ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে জমির সব ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। তিন দিন ধরেও পানি না নামায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি।

শনিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে পানির নিচে থাকা ধান কাটতে যান আহাদ। কিন্তু মাঠে গিয়ে নিজের চোখে সব ধান ডুবে থাকতে দেখে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

আহাদের বড় ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আহম্মদ হোসেন বলেন, “সব ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে—এই দৃশ্যটা সে সহ্য করতে পারেনি। মাঠেই অসুস্থ হয়ে মারা গেল।”

ভাতিজা ফারুক মিয়া জানান, ঋণের টাকায় চাষ করা ফসল হারানোর শোকই তার চাচার মৃত্যুর প্রধান কারণ। “সব শেষ হয়ে গেছে—এই কষ্টটাই তিনি নিতে পারেননি,” বলেন তিনি।

এদিকে একই চিত্র গোটা নাসিরনগরের হাওরজুড়ে। জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, অন্তত এক হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পচে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা অপরিপক্ব ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে, যাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিয়োগ করে ধান কাটছেন কৃষকরা। কিন্তু পানির নিচে থাকায় অনেক ধানে ইতোমধ্যেই পচন ধরেছে, আবার অনেক ধান পুরোপুরি পাকে নি—ফলে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে বহুগুণে।

মহাকাল পাড়ার কৃষক আবু লাল মিয়া জানান, ২০ কানি জমিতে ধান করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কানি জমির ধান তুলতে পেরেছেন, বাকি ১৫ কানি এখনো পানির নিচে। “কি করব বুঝতে পারছি না,” অসহায় কণ্ঠে বলেন তিনি।

আরেক কৃষক আবু লাল বলেন, উচ্চ সুদে দাদন নিয়ে চাষ করেছিলেন। “ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করব—এই আশা ছিল। এখন সব পানির নিচে। সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছি না,” বলেন তিনি।

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সহায়তার জন্য পাঠানো হয়েছে। হাওরের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একদিকে পানিতে ডুবে যাচ্ছে সোনালি ফসল, অন্যদিকে ভেঙে পড়ছে কৃষকের স্বপ্ন—নাসিরনগরের হাওর যেন এখন এক নিঃশব্দ কান্নার নাম।