
পাহাড়ি ঢল, কালবৈশাখী ও টানা অতিবৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হাওর ও নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির নিচে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান, ভুট্টা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। কোথাও শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না, আবার কোথাও কাটা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়লেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা তারা পাননি। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি ও সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সুনামগঞ্জে হাওরজুড়ে দুর্ভোগ
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বহু জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় এখন ধান কাটা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক সমিরণ শর্মা জানান, তার বেশ কিছু জমির ধান ইতোমধ্যে পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক ধানে অঙ্কুর বের হয়ে পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং কিছু কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওরের ধান পানির নিচে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের বিভিন্ন হাওরে অন্তত ৩০৫ হেক্টর জমির বোরো ধান এখনো পানির নিচে রয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আগাম ধান কাটার কারণে বড় ধরনের ক্ষতি কিছুটা কমানো গেলেও বাকি জমিগুলো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গাইবান্ধায় শ্রমিক সংকটে বিপাকে কৃষক
গাইবান্ধার নদীবেষ্টিত নিম্নাঞ্চলেও বৃষ্টির কারণে ধানক্ষেত তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় ধান কাটা শুরু হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকের উদ্বেগ বাড়ছে।
ঝিনাইদহে মাঠজুড়ে সোনালি ধান, কিন্তু কৃষকের মনে শঙ্কা
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকা বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে। কিন্তু টানা কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও বৃষ্টিতে মাঠে থাকা ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনো জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ ধান মাঠেই রয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নারী শ্রমিকরাও ধান কাটা ও মাড়াই কাজে অংশ নিচ্ছেন।
ময়মনসিংহে শিলাবৃষ্টি ও বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি
গফরগাঁও ও নান্দাইল উপজেলায় কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি ও টানা বর্ষণে শত শত হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
নান্দাইল উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, প্রায় ২০২ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি তলিয়ে গেছে এবং কয়েকশ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বরগুনার বেতাগীতে শাকসবজিসহ নানা ফসলের ক্ষতি
উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগীতেও টানা বৃষ্টিতে বোরো ধান, শাকসবজি, মুগডাল, মরিচ ও বাদাম চাষে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় গাছ পচে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নেত্রকোনায় দুর্যোগের পর দুর্যোগ
কেন্দুয়ায় মৌসুমের শুরুতেই বীজ সমস্যার কারণে শত শত হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় আরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, একের পর এক দুর্যোগে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে ধানক্ষেত
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিবৃষ্টিতে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত পানি নেমে গেলে কিছু ফসল রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। তবে পানি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
কুড়িগ্রামে ভুট্টা চাষে বিপর্যয়ের শঙ্কা
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও রোদের অভাবে ভুট্টা চাষে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
কৃষকের মুখে হতাশা, বাড়ছে উদ্বেগ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে তারা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেকের ধারদেনা করে আবাদ করা ফসল এখন পানির নিচে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত সরকারি সহায়তা, কৃষি প্রণোদনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না নিলে অনেক কৃষক মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 



















