
“সবার আগে বাংলাদেশ, করবো কাজ, গড়বো দেশ”- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি। “We Have a Plan” শীর্ষক অঙ্গীকারের আলোকে সরকার একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, নদী-খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বহুমুখী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। একই সঙ্গে এসব কর্মসূচি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন গণযোগাযোগ অধিদপ্তরও দেশব্যাপী বিশেষ প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে বুধবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা তথ্য অফিসের আয়োজনে “বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রচার কার্যক্রমের স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময়” সভা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সম্মানিত অতিথি চাঁপাইনবাবগঞ্জ -১ আসনের সংসদ সদস্য ড. মোঃ কেরামত আলী। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন বিষয় সঞ্চালনা করেন জেলা তথ্য অফিসার রুপ কুমার বর্মন। এসময় বক্তব্য রাখেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি গোলাম মোস্তফা মন্টু, দৈনিক চাঁপাই দর্পণের সম্পাদক মোঃ আশরাফুল ইসলাম রঞ্জু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ টেলিভিষন জার্নালিস্ট এ্যাসোশিয়েশনের সভাপতি মোঃ রফিকুল আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফয়সায় মাহমুদ। এসময় জেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রকি গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের সবচেয়ে আলোচিত সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এটি একটি ডিজিটাল স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে কার্ড প্রদান করা হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে দেশের প্রায় ৫০ লাখ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিএন্ডটি মাঠে গত ১৯ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৪ উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ৩৭ হাজার ৫৬৭টি হতদরিদ্র পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, ভূমিহীন পরিবার, দিনমজুর, প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে এমন পরিবার এবং অনিয়মিত আয়ের মানুষজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে সরকার গ্রহণ করেছে নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ৫১০টি নদী এবং হাজারো খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে দেশের ৫৪ জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা কমবে, সেচ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় গত ১৬ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নবাব খালের প্রায় ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরও ২৬টি খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য ২৪৭ দশমিক ২৫ কিলোমিটার।
পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সরকার গ্রহণ করেছে বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। “সবুজ হোক দেশ, নির্মল হোক পরিবেশ” স্লোগানে আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নারী, যুবক-যুবতী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা আরও আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সরকার আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে। সার্কুলার অর্থনীতির মডেলে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য সরকার চালু করছে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি। “কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ”— এই প্রতিপাদ্যে কৃষকদের সহজ শর্তে সহায়তা, ভর্তুকি, কৃষিঋণ সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে। কৃষকরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা ছাড়াও উন্নত বীজ, সার, কৃষি প্রশিক্ষণ, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র, সেচ সুবিধা, আবহাওয়ার তথ্য এবং বাজারদর সম্পর্কিত তথ্য পাবেন।
গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রথম পর্যায়ের কৃষক কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথম ধাপে ১০ জেলার ১১ উপজেলার প্রায় ১ লাখ কৃষক এ সুবিধা পাচ্ছেন। আগামী চার বছরে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়া সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতের প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ করা হবে।
সরকারের এসব উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ১৬০ দিনের বিশেষ প্রচার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মে ২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী ১ হাজার ২১টি উঠান বৈঠক ও কমিউনিটি সভা, ২০২টি নারী সমাবেশ, ১১ হাজার ৬০টি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ৩ হাজার ২৪৮টি মাইকিং কার্যক্রম, ২ হাজার ১৬টি অনলাইন প্রচারণা এবং বিভিন্ন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের লাইভ প্রচার সম্পন্ন হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা তথ্য অফিসও সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। এ সময়ে জেলায় ৬টি উঠান বৈঠক, ২টি নারী সমাবেশ, ১৩৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ৩০টি অনলাইন প্রচার এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কর্মসূচির ৪টি লাইভ সম্প্রচার আয়োজন করা হয়েছে।
গণযোগাযোগ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে আরও ৪ হাজার উঠান বৈঠক, ১২ হাজার ২৪০টি নারী সমাবেশ, ৪০ হাজার ৮০০টি চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, ৮ হাজার ১৬০টি সংগীতানুষ্ঠান ও অসংখ্য আলোচনা সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ঘোষিত এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি উন্নত, বৈষম্যহীন, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 



















