
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকারি দপ্তরের দায়িত্ব পালনের সময় এক চিকিৎসককে প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী দেখার অভিযোগে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে জেলায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা, অফিস চলাকালে ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনের নীতিমালা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আরামবাগ এলাকার চাঁপাই অ্যাপোলো হাসপাতালে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, সরকারি চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ডা. মো. ইনজামাম উল হক একটি কক্ষে রোগী দেখছিলেন। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলে তিনি দ্রুত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা।
জানা গেছে, ডা. ইনজামাম উল হক চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (কো-অর্ডিনেটর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে চাঁপাই অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার সময় সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি এক রোগীর আলট্রাসনোগ্রাম করছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়েই তিনি চেয়ার ছেড়ে দ্রুত হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যান।
পরে হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে তিনি দাবি করেন, তিনি সেখানে নামাজ পড়তে এসেছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মিনার আহমেদ ও সাকির আলী জানান, হঠাৎ করেই হাসপাতাল থেকে এক চিকিৎসককে দ্রুত বেরিয়ে আসতে দেখেন। তার পেছনে কয়েকজন সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরে জানতে পারেন, অফিস চলাকালে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।ফেসবুক ব্যবহারকারী আমিনুল ইসলাম লিখেছেন,”সরকারি চাকরিতে থেকে অফিস সময়েই যদি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে কীভাবে? বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
চাঁপাই অ্যাপোলো হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন এবং হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শ্রী বিশ্বজিৎ বলেন, ডা. ইনজামাম উল হক দুপুরের বিরতির সময় হাসপাতালে এসেছিলেন।
শ্রী বিশ্বজিৎ দাবি করেন,”সম্প্রতি একটি সিন্ডিকেট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। ঘটনাটি মূলত ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে।”

ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. মো. ইনজামাম উল হকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে রাতের দিকে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন,”আজ চারজন সাংবাদিক ও ডা. মো. ইনজামাম উল হকের মধ্যে উদ্ভূত ভুল বোঝাবুঝির সুষ্ঠু সমাধান হয়েছে। সবাই নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন,”ডা. ইনজামাম উল হক সকাল থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে অফিসে ছিলেন। এরপর তিনি কোথায় গেছেন, তা আমার জানা নেই। অফিস চলাকালে কোনো সরকারি চিকিৎসকের প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি চিকিৎসকদের নির্ধারিত অফিস সময়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হয়। অফিস চলাকালে অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা প্রদান শৃঙ্খলাভঙ্গের আওতায় পড়তে পারে। এ ধরনের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এদিকে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সরকারি সেবার মান ও জনআস্থা বজায় রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 


















