
দেশের দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের অন্তত সাতটি জেলায় কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নওগাঁ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন লাখো মানুষ, যাদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এদিকে কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমন ধানের বীজতলা, আউশ ধান ও মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
বান্দরবানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বান্দরবানের বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে, যেখানে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
দুর্গতদের জন্য রান্না করা খাবার, শুকনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে প্রশাসন। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে।
কক্সবাজারে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি
কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় টানা বর্ষণে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, মাতামুহুরী ও ঈদগাঁও এলাকায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে পড়েছে, কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। দুর্গতদের সহায়তায় জেলা প্রশাসন নগদ অর্থ, চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছে এবং একটি কন্ট্রোল রুমও চালু করেছে।
খাগড়াছড়িতে ধীরগতিতে নামছে পানি
খাগড়াছড়িতে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও জলাবদ্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দীঘিনালা, মেরুং ও কবাখালী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক এবং দীঘিনালা-লংগদু সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে থাকায় বন্ধ রয়েছে যান চলাচল।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, শত শত হেক্টর আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও বন্যার দ্বিমুখী সংকট
রাঙামাটিতে অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি অন্তত ৩০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ২৬৫ জন মানুষ বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়কে পাহাড়ধস ও ফাটল দেখা দেওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের ধাপে ধাপে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টিপাত, বিপর্যস্ত যোগাযোগ
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে প্রায় ২৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং চট্টগ্রাম-রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। কয়েকটি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

নওগাঁয় একদিনে ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত
টানা প্রায় ২০ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে নওগাঁ শহরের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। শহরের প্রধান সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে একদিনে সর্বোচ্চ।
মৌলভীবাজারে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে
মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। কয়েকটি স্থানে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং সড়ক, কালভার্ট ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
সুনামগঞ্জে নিচু এলাকা প্লাবিত
টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সীমান্তবর্তী নদীগুলো দিয়ে উজানের ঢল অব্যাহতভাবে নামতে থাকায় অন্তত ৫০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এবং কয়েকটি সড়ক ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বিঘ্ন।
অন্যান্য জেলাতেও চলছে দুর্ভোগ
সিলেটে টিলাধসের ঘটনা ঘটলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। হবিগঞ্জে খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। এদিকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং বহু সড়ক তলিয়ে গেছে পানির নিচে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
দুর্গত এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 




















