
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার বাজারে নকল কীটনাশক তৈরি, অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সার মজুত এবং কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পুলিশ ও উপজেলা কৃষি বিভাগের যৌথ অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়ে একটি ভেজাল কীটনাশক তৈরির চক্র। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মো. সদের আলীকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় আতাহার বাজারের মেসার্স সদের ট্রেডার্স নামক সার ও কীটনাশকের দোকানে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানকালে দেখা যায়, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে নকল কীটনাশক প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এ সময় দোকানের মালিক মো. সদের আলী (৩৮)-কে হাতেনাতে আটক করা হয়।
দোকান ও সংলগ্ন গোডাউন তল্লাশি করে প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিকের বোতল, খালি কীটনাশকের প্যাকেট, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্র এবং নকল কীটনাশক তৈরির নানা সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
এছাড়া পাশের আরেকটি গোডাউন থেকে ৩০৭ বস্তা ইউরিয়া, ২৪৪ বস্তা এমওপি, ১৯ বস্তা ডিএপি ও ৩ বস্তা টিএসপি সার জব্দ করা হয়। স্টক রেজিস্টার যাচাই করে প্রকৃত মজুদ ও কাগজপত্রের হিসাবে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী পর্যাপ্ত বিক্রয় রসিদ ও নিবন্ধনপত্রও দেখাতে ব্যর্থ হন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের অবৈধ মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির কারণে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সময়মতো সার না পেয়ে অনেক কৃষককে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে সার কিনতে হয় অথবা প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে পারেন না, যার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকারি নির্ধারিত সরবরাহব্যবস্থা এড়িয়ে গোপনে সার মজুত করে রাখেন এবং পরবর্তীতে সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটে নেন। পাশাপাশি ভেজাল কীটনাশক বাজারজাতকরণের ফলে কৃষকদের ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনাইন বিন জামানের প্রসিকিউশনের ভিত্তিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেন। এর প্রেক্ষিতে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মো. সদের আলীকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ ইকরামুল হক নাহিদ।

জব্দকৃত রাসায়নিক দ্রব্যাদির যথাযথ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে রয়েছেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক।
কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় জব্দকৃত সার সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ পরে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় দোকান মালিককে ফেরত দেওয়া হবে। এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জামতাড়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমানকে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা, ভেজাল কীটনাশক প্রতিরোধ এবং সারের কৃত্রিম সংকট নিরসনে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা হবে। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কৃষকের শ্রমকে পুঁজি করে যারা অবৈধ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ 























