ঢাকা ০৩:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
‘চোখের সামনে আমার গ্রামটা অদৃশ্য হয়ে গেল’: নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন জনপদ রদ্রির অভিষেক ম্যাচে বিলবাওকে হারিয়ে বার্সেলোনার টানা দ্বিতীয় জয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষে ৫ বছরের শিশুর মৃত্যু আরেকটি বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে উদ্ধার অভিযান স্থগিত আলভারেজকে নিয়ে এখনও আশাবাদী বার্সেলোনা মাগুরা মেডিকেল কলেজের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে মুখরিত ক্যাম্পাস শিবগঞ্জ শ্যামপুরে এসএসসিতে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা দিলেন ইউপি চেয়ারম্যান শিবগঞ্জে অটোরিকশার লোভে চালক রুমন হত্যা-গ্রেপ্তার ৩ প্রকৌশলী অধিকার দিবসে বেরোবিতে মোমবাতি প্রজ্বলন ও মৌন মিছিল অনুষ্ঠিত মেধাবী শিক্ষার্থী ফাতেমা পেলেন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার অনুদান

‘চোখের সামনে আমার গ্রামটা অদৃশ্য হয়ে গেল’: নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন জনপদ

বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালের দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা

নেপালের ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যায় কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে গেছে একটি জনপদের চিত্র। পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। শৈশবের পরিচিত গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার খবর দূরে বসেই ছবি, ভিডিও ও ফোনকলের মাধ্যমে জানতে হয়েছে নেপালের সাংবাদিক অর্জুন পৌডেলকে।

বুধবার সকালে কাঠমান্ডুতে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় স্ত্রীর ফোন পান অর্জুন। স্ত্রী জানান, ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে এবং সোল বাজার ও বেত্রাবতী এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মানুষ আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।

প্রথমে খবরটি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। কারণ সোল তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার গ্রাম। নদীর তীর থেকে গ্রামটির অবস্থান প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে। জীবনের ৪৪ বছরে তিনি এমন কোনো বন্যার কথা দেখেননি, যা এত উঁচু এলাকায় পৌঁছাতে পারে।

তবে কিছু সময় পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যার খবর দেখে তার উদ্বেগ বাড়তে থাকে। তিনি যোগাযোগ করেন সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনের সঙ্গে। নিরঞ্জনের পরিবারের সদস্যরাও ওই এলাকায় থাকেন। কিন্তু তখন পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।

এরপর শুরু হয় স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে একের পর এক যোগাযোগের চেষ্টা। অবশেষে এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারলে অর্জুন জানতে পারেন, গ্রামের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।

এরপর মোবাইলে আসতে থাকে ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, বেত্রাবতী বাজারের বড় একটি অংশ বন্যার স্রোতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুর্যোগে অর্জুনের নিজের পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার বড় ফুফু, ফুফুর ছেলে মধু ও তার স্ত্রী পানির স্রোতে ভেসে যান। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেদিন সকালে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে বের হওয়া তার মামারও আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্জুন জানতে পারেন, গ্রামের বড় অংশ কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক মানুষ জীবন বাঁচাতে পাহাড়ের খাড়া ঢালে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষকও ফোনে জানান, তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছেন না। তার দাবি, বেত্রাবতী এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। স্কুলের একটি যানবাহনও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আহত মানুষ সাহায্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অর্জুনের বন্ধু নিরঞ্জনের পরিবারও এই ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায়নি। তার বাবা-মা, চাচা-চাচি এবং ছোট বোন হিমানিসহ পরিবারের একাধিক সদস্য পানির স্রোতে ভেসে যান।

ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বেত্রাবতী এলাকাটি বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপাল ও তিব্বতের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভয়াবহ বন্যার কারণে সড়ক ও সেতু ভেঙে পড়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোও। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা পুরোনো ও নতুন কয়েকটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলা সদর বিদুরের সঙ্গে বহু এলাকার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। রাসুয়া জেলার অনেক গ্রাম এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পাশের ধাদিং জেলার কয়েকটি এলাকাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চিকিৎসাসেবাও বড় সংকটে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়ক ও সেতু না থাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।

বন্যার ধাক্কায় কৃষিজমি ও খাদ্য মজুদও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ঘরে থাকা শস্য ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন স্থাপনাও বন্যায় নষ্ট হয়েছে।

অর্জুন পৌডেল প্রায় দেড় দিন ধরে নিজের গ্রামে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তিনি জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছেন।

যে গ্রামে শৈশব কেটেছে, কয়েক মিনিটের বন্যায় সেই গ্রাম আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অর্জুনের মতো এলাকার অসংখ্য মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন—এই জনপদ কি কখনো আবার আগের রূপ ফিরে পাবে?

সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

জনপ্রিয় সংবাদ

‘চোখের সামনে আমার গ্রামটা অদৃশ্য হয়ে গেল’: নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন জনপদ

‘চোখের সামনে আমার গ্রামটা অদৃশ্য হয়ে গেল’: নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিশ্চিহ্ন জনপদ

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৪৩:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

নেপালের ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যায় কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে গেছে একটি জনপদের চিত্র। পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। শৈশবের পরিচিত গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার খবর দূরে বসেই ছবি, ভিডিও ও ফোনকলের মাধ্যমে জানতে হয়েছে নেপালের সাংবাদিক অর্জুন পৌডেলকে।

বুধবার সকালে কাঠমান্ডুতে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় স্ত্রীর ফোন পান অর্জুন। স্ত্রী জানান, ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে এবং সোল বাজার ও বেত্রাবতী এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মানুষ আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।

প্রথমে খবরটি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। কারণ সোল তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার গ্রাম। নদীর তীর থেকে গ্রামটির অবস্থান প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে। জীবনের ৪৪ বছরে তিনি এমন কোনো বন্যার কথা দেখেননি, যা এত উঁচু এলাকায় পৌঁছাতে পারে।

তবে কিছু সময় পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যার খবর দেখে তার উদ্বেগ বাড়তে থাকে। তিনি যোগাযোগ করেন সাংবাদিক বন্ধু নিরঞ্জনের সঙ্গে। নিরঞ্জনের পরিবারের সদস্যরাও ওই এলাকায় থাকেন। কিন্তু তখন পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না।

এরপর শুরু হয় স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে একের পর এক যোগাযোগের চেষ্টা। অবশেষে এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারলে অর্জুন জানতে পারেন, গ্রামের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং অনেক মানুষ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।

এরপর মোবাইলে আসতে থাকে ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, বেত্রাবতী বাজারের বড় একটি অংশ বন্যার স্রোতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুর্যোগে অর্জুনের নিজের পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার বড় ফুফু, ফুফুর ছেলে মধু ও তার স্ত্রী পানির স্রোতে ভেসে যান। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেদিন সকালে গবাদিপশুর জন্য ঘাস কাটতে বের হওয়া তার মামারও আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

স্থানীয় ওয়ার্ড চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্জুন জানতে পারেন, গ্রামের বড় অংশ কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক মানুষ জীবন বাঁচাতে পাহাড়ের খাড়া ঢালে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষকও ফোনে জানান, তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছেন না। তার দাবি, বেত্রাবতী এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। স্কুলের একটি যানবাহনও বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বিভিন্ন স্থানে আহত মানুষ সাহায্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অর্জুনের বন্ধু নিরঞ্জনের পরিবারও এই ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায়নি। তার বাবা-মা, চাচা-চাচি এবং ছোট বোন হিমানিসহ পরিবারের একাধিক সদস্য পানির স্রোতে ভেসে যান।

ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বেত্রাবতী এলাকাটি বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপাল ও তিব্বতের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই অঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ভয়াবহ বন্যার কারণে সড়ক ও সেতু ভেঙে পড়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোও। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা পুরোনো ও নতুন কয়েকটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলা সদর বিদুরের সঙ্গে বহু এলাকার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। রাসুয়া জেলার অনেক গ্রাম এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। পাশের ধাদিং জেলার কয়েকটি এলাকাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চিকিৎসাসেবাও বড় সংকটে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সড়ক ও সেতু না থাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।

বন্যার ধাক্কায় কৃষিজমি ও খাদ্য মজুদও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ঘরে থাকা শস্য ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন স্থাপনাও বন্যায় নষ্ট হয়েছে।

অর্জুন পৌডেল প্রায় দেড় দিন ধরে নিজের গ্রামে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তিনি জেলা সদর বিদুরেই আটকে আছেন।

যে গ্রামে শৈশব কেটেছে, কয়েক মিনিটের বন্যায় সেই গ্রাম আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অর্জুনের মতো এলাকার অসংখ্য মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন—এই জনপদ কি কখনো আবার আগের রূপ ফিরে পাবে?

সূত্র: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম