
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে সোমবার বিকেলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চারজন। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় হাসপাতালের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই ছিল তালাবদ্ধ। এতে মাত্র একটি সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টায় তীব্র ভিড় ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়, যার ফলে কয়েকজন পদদলিত হয়ে ও চাপা পড়ে প্রাণ হারান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিঁড়ি বন্ধ রাখার তথ্য স্বীকার করলেও আগুনের কারণে এই মৃত্যুর অভিযোগ মানতে নারাজ। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা গেছে, সোমবার বিকেলে হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আচমকা আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে, যার জেরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন রোগী, তাঁদের আত্মীয়স্বজন, চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীরা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা রোগীর একজন আত্মীয় লিটন মিয়া জানান, জরুরি নির্গমনের কেঁচি গেটগুলোর মধ্যে একটি বাদে বাকি সব বন্ধ পান তাঁরা, ফলে বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীর কিছুক্ষণ আগেই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি এবং এ দুর্ঘটনার দায় হাসপাতাল প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ এড়াতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন।
শেরপুরের নকলা থেকে আসা সালমা আক্তার তাঁর সাত বছর বয়সী সন্তান আলিফকে নিয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্डে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যে তাঁর মনে হয়েছিল, সন্তানকে নিয়ে বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত অন্যদের সহায়তায় সিঁড়ির তালা ভেঙে বাইরে আসতে সক্ষম হন তাঁরা।
একই ওয়ার্ডের স্বর্ণা আক্তার জানান, আচমকা চিৎকার-হুড়োহুড়ি শুরু হলে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে দেখেন লিফটে দাউদাউ আগুন জ্বলছে। সন্তানকে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টায় একের পর এক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে।
ঘটনার পর থেকে এখনো আতঙ্ক কাটেনি রোগী ও তাঁদের পরিজনদের মধ্যে। জরুরি মুহূর্তে সিঁড়ি বন্ধ রাখার বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। মঙ্গলবার বিকেলে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় কথা হয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ফরিদা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আচমকা প্রচণ্ড শব্দে আগুন শুরু হওয়ার পর তিনতলা থেকে নামার সময় দুবার পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে একজনের সাহায্যে বাইরে বেরিয়ে কীভাবে বাসায় ফিরেছেন, তা তাঁর মনে নেই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অফিস সময় শেষ হওয়ার পর প্রতিদিনই নিয়ম মেনে চারটি সিঁড়ির গেট বন্ধ রাখা হতো। তবে এই দুর্ঘটনার পর থেকে সব সিঁড়ির গেট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, আগুনের ঘটনায় সরাসরি কারো মৃত্যু হয়নি বলে তাঁর দাবি। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মৃত্যুর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা পড়লে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান তিনি।
নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়িয়ার শাহজাহান মনির, রমজান আলী, তারাকান্দার কুলসুম আক্তার এবং নেত্রকোনার পূর্বধলার হাজেরা বেগম আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে বা ভিড়ের চাপে আটকে পড়ে মারা যান। তাঁরা অভিযোগ করেন, নিরাপদে বেরিয়ে আসার পথ না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়, এবং এ মৃত্যুর জন্য হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিকেই দায়ী করছেন তাঁরা।
শফিয়েল আলম সুমন,ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 




















